বিল গেটসের জীবনকাহিনি: মাইক্রোসফটের উত্থান, বিপুল সম্পদ, দাতব্য কর্মকাণ্ড, বিতর্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
সুরাঙ্গন নিউজ ডেস্ক: ১৯৭৫ সালের এপ্রিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আলবুকার্কি শহরে দুজন তরুণ একটি অফিস ভাড়া নিয়েছেন। একজনের বয়স ২২, অন্যজনের ১৯। শহরের এমআইটিএস (MITS) নামের একটি ছোট ইলেকট্রনিকস কোম্পানি বাজারে এনেছে ‘আলতাইর ৮৮০০’ নামের একটি কিট-কম্পিউটার, যা প্রযুক্তিপ্রেমীরা নিজেরাই যন্ত্রাংশ জুড়ে তৈরি করে নিতে পারতেন। সেই কম্পিউটারের জন্য বেসিক (BASIC) নামের প্রোগ্রামিং ভাষার একটি সংস্করণ তৈরি করেছেন এই দুই তরুণ।
তাঁদের নতুন কোম্পানির নাম ‘মাইক্রো-সফট’ মাইক্রোকম্পিউটার ও সফটওয়্যার শব্দ দুটির সমন্বয়ে তৈরি নাম। ১৯৭৫ সালের জুলাইয়ে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে এই নাম ব্যবহার শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে নামটি হয় মাইক্রোসফট।
তরুণ দুজনের একজন উইলিয়াম হেনরি গেটস তৃতীয়, যিনি সারা বিশ্বে বিল গেটস নামে পরিচিত। অন্যজন তাঁর বন্ধু পল অ্যালেন। তখন তাঁদের কোম্পানিতে কর্মীর সংখ্যা হাতে গোনা, আয়ও সীমিত। অথচ পরবর্তী কয়েক দশকে তাঁদের তৈরি সফটওয়্যার বিশ্বের কোটি কোটি কম্পিউটারে জায়গা করে নেবে। আর বিল গেটস হয়ে উঠবেন বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি।
গেটসের জীবনকাহিনি বলতে গেলে প্রথমেই ‘ড্রপআউট’ শব্দটি সামনে আসে। হার্ভার্ডের মতো নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে তা ছেড়ে দেওয়া এক তরুণের বিশ্বজয়ের গল্প অনেককেই অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু তাঁর সাফল্যের পেছনের বাস্তবতা আরও জটিল। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া ছেড়েছিলেন ঠিকই, তবে একেবারে শূন্য থেকে কিংবা সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে নয়। শৈশব থেকেই তিনি এমন একটি পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন, যেখানে শিক্ষার সুযোগ, পারিবারিক সহায়তা এবং কম্পিউটারের মতো ব্যয়বহুল প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বিরল সুযোগ ছিল।
যে স্কুলের কম্পিউটার টার্মিনাল বদলে দিল জীবন
বিল গেটসের জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৮ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সিয়াটল শহরে। তাঁর বাবা উইলিয়াম এইচ. গেটস সিনিয়র ছিলেন আইনজীবী। মা মেরি গেটস শিক্ষকতা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই গেটস ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, কৌতূহলী ও প্রতিযোগিতাপ্রিয়। পড়াশোনায় ভালো করলেও নিজের পছন্দের বিষয়ের বাইরে অন্য কিছুতে তাঁর আগ্রহ তুলনামূলক কম ছিল। প্রযুক্তির প্রতি তাঁর আকর্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে মাত্র ১৩ বছর বয়সে।
১৯৬৮ সালে তাঁকে সিয়াটলের বেসরকারি লেকসাইড স্কুলে ভর্তি করানো হয়। ষাটের দশকের শেষ দিকে স্কুলটির অভিভাবকদের একটি সংগঠন অর্থ সংগ্রহ করে একটি টেলিটাইপ টার্মিনাল কেনে। এর মাধ্যমে টেলিফোন লাইনে দূরের একটি মেইনফ্রেম কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত। তখন ব্যক্তিগত কম্পিউটারের যুগ শুরু হয়নি। কম্পিউটার ছিল ব্যয়বহুল, আর স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের হাতে এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ ছিল অত্যন্ত বিরল।
গেটস ও তাঁর কয়েকজন সহপাঠী দ্রুতই সেই টার্মিনালের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তাঁরা প্রোগ্রামিং শিখতে শুরু করেন এবং ক্লাসের বাইরের অনেকটা সময় কম্পিউটারের সামনে কাটাতে থাকেন। এই বন্ধুদের একজন ছিলেন গেটসের চেয়ে প্রায় দুই বছরের বড় পল অ্যালেন। প্রোগ্রামিং নিয়ে তাঁদের যৌথ আগ্রহ, বন্ধুত্ব এবং ভবিষ্যতে একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই সময়েই। স্কুলজীবনেই গেটস ও অ্যালেন ‘ট্রাফ-ও-ডেটা’ নামে একটি ছোট উদ্যোগ শুরু করেন। সড়কে যানবাহন চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কাজে লাগানোর জন্য তাঁরা একটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। উদ্যোগটি বড় ব্যবসায় পরিণত হয়নি। তবে মাইক্রোপ্রসেসর, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও বাস্তব প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁদের পরবর্তী জীবনে কাজে আসে।
গেটসের সাফল্য তাই কোনো আকস্মিক প্রতিভার বিস্ফোরণ ছিল না। বরং ছোটবেলায় পাওয়া একটি বিরল সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের দক্ষতা বাড়ানো এবং সেই দক্ষতাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দেওয়ার ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ, একটি দুঃসাহসী ফোন
১৯৭৩ সালে গেটস ভর্তি হন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, তিনি হয়তো আইন পেশায় যাবেন। কিন্তু তাঁর আগ্রহ ছিল কম্পিউটার, গণিত ও প্রোগ্রামিংয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও তিনি কম্পিউটার ল্যাবে অনেকটা সময় কাটাতেন। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় স্টিভ বালমারের সঙ্গে, যিনি পরবর্তী সময়ে মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী হন।
১৯৭৪ সালের শেষ দিকে পল অ্যালেনের চোখে পড়ে ‘পপুলার ইলেকট্রনিকস’ সাময়িকীর ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি সংখ্যার প্রচ্ছদ। তাতে ছিল আলতাইর ৮৮০০ কম্পিউটারের ছবি। ব্যক্তিগত কম্পিউটার তৈরির নতুন সম্ভাবনা দেখে অ্যালেন বুঝতে পারেন, এই যন্ত্রের জন্য সফটওয়্যার তৈরি করা গেলে বড় একটি বাজার গড়ে উঠতে পারে। তিনি বিষয়টি গেটসকে জানান। দুজনই উপলব্ধি করেন, কম্পিউটার তৈরির প্রযুক্তি যত মানুষের নাগালে আসবে, ততই প্রয়োজন হবে কম্পিউটারকে কাজ করানোর নির্দেশনা বা সফটওয়্যারের। তাঁরা সেই সুযোগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তাঁরা আলতাইর নির্মাতা এমআইটিএসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। গেটস ও অ্যালেন জানান, আলতাইর কম্পিউটারের জন্য তাঁদের কাছে বেসিক প্রোগ্রামিং ভাষার একটি সংস্করণ প্রস্তুত রয়েছে। বাস্তবে তখন তাঁদের কাজ অনেকটাই বাকি। কিন্তু সম্ভাবনাটি কাজে লাগাতে তাঁরা দ্রুত প্রোগ্রাম তৈরির কাজে নেমে পড়েন।
হার্ভার্ডের কম্পিউটারে আলতাইরের প্রসেসরের অনুকরণে প্রোগ্রাম পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করে তাঁরা কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজ করেন। অ্যালেন পরে তৈরি সফটওয়্যার নিয়ে আলবুকার্কিতে যান। সেখানে আলতাইর কম্পিউটারে প্রথমবার চালানোর সময় প্রোগ্রামটি কাজ করে। এটি ছিল তাঁদের জন্য বড় সাফল্য। এই সাফল্যের পর গেটস হার্ভার্ডের পড়াশোনা থেকে বিরতি নিয়ে মাইক্রোসফটের কাজে পুরোপুরি মনোযোগ দেন। সেই বিরতি আর পড়াশোনায় ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে শেষ হয়নি। তবে ২০০৭ সালে হার্ভার্ড তাঁকে সম্মানসূচক ডিগ্রি দেয়। গেটসের সিদ্ধান্তে ঝুঁকি ছিল যথেষ্ট। তখন ব্যক্তিগত কম্পিউটারের বাজার সদ্য তৈরি হচ্ছে। কম্পিউটার কেনার মতো ক্রেতা ছিল সীমিত, আর সফটওয়্যারের জন্য আলাদা অর্থ দিতে হবে; এই ধারণাও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। শখের প্রোগ্রামারদের মধ্যে সফটওয়্যার বিনা মূল্যে কপি করে ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতা ছিল প্রবল।
১৯৭৬ সালে গেটস ‘হবিস্টদের উদ্দেশে খোলাচিঠি’ প্রকাশ করে সফটওয়্যার বিনা মূল্যে কপি ও বিতরণের সংস্কৃতির সমালোচনা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সফটওয়্যার তৈরির জন্য সময়, দক্ষতা ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। ব্যবহারকারীরা যদি এর মূল্য না দেন, তাহলে উন্নত সফটওয়্যার তৈরির প্রণোদনা কমে যাবে। তাঁর বক্তব্য তখন অনেক কম্পিউটারপ্রেমীর বিরাগভাজন হয়। কেউ কেউ তাঁকে অতিরিক্ত বাণিজ্যিক মনোভাবের অধিকারী বলে সমালোচনা করেন। কিন্তু সফটওয়্যারকে স্বতন্ত্র বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তাঁর এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এমএস-ডস: বিক্রির চেয়ে লাইসেন্সে বড় সাফল্য
১৯৭৯ সালে মাইক্রোসফট নিউ মেক্সিকো ছেড়ে সিয়াটলের কাছাকাছি বেলভিউতে চলে আসে। এরপর ১৯৮০ সালে কোম্পানির ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার মতো একটি সুযোগ আসে। কম্পিউটার নির্মাতা আইবিএম তখন ব্যক্তিগত কম্পিউটার বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাদের নতুন কম্পিউটার চালানোর জন্য একটি অপারেটিং সিস্টেম দরকার ছিল। আইবিএম প্রথমে মাইক্রোসফটের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু মাইক্রোসফটের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম তখন প্রস্তুত ছিল না। গেটস আইবিএমকে ডিজিটাল রিসার্চ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। সেখানে আলোচনা সফল না হওয়ার পর আইবিএম আবার মাইক্রোসফটের কাছে ফিরে আসে।
গেটস ও অ্যালেন তখন সিয়াটল কম্পিউটার প্রোডাক্টস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি অপারেটিং সিস্টেম অধিগ্রহণের ব্যবস্থা করেন। পরে সেটিকে পরিবর্তন ও উন্নত করে আইবিএমের কম্পিউটারের উপযোগী করা হয়। এর মধ্য দিয়েই তৈরি হয় এমএস-ডস (MS-DOS)। এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সফটওয়্যারের মালিকানা ও ব্যবহারের অধিকার। আইবিএমের কাছে অপারেটিং সিস্টেমটির সব অধিকার বিক্রি করে দেওয়ার পরিবর্তে মাইক্রোসফট লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা করে। ফলে আইবিএমের কম্পিউটারের জন্য সফটওয়্যার সরবরাহ করার পাশাপাশি অন্য কম্পিউটার নির্মাতাদের কাছেও এমএস-ডস লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ মাইক্রোসফটের হাতে থেকে যায়।

১৯৮১ সালে আইবিএমের ব্যক্তিগত কম্পিউটার বাজারে আসে। পরে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান আইবিএম-সামঞ্জস্যপূর্ণ কম্পিউটার তৈরি করতে শুরু করে। এসব কম্পিউটারের বিপুল অংশে এমএস-ডস ব্যবহৃত হতে থাকে। এভাবেই মাইক্রোসফটের ব্যবসায়িক মডেল দ্রুত প্রসারিত হয়। কম্পিউটারের যন্ত্রাংশের দাম কমতে থাকে, নতুন নির্মাতা ও ব্যবহারকারী বাজারে আসেন, আর অপারেটিং সিস্টেমের চাহিদাও বাড়ে। প্রতিটি নতুন কম্পিউটারের সঙ্গে মাইক্রোসফটের সফটওয়্যার লাইসেন্স থেকে আয় করার সুযোগ তৈরি হয়।
এই সিদ্ধান্ত গেটসের ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার অন্যতম উদাহরণ। তিনি বুঝেছিলেন, কম্পিউটার শিল্পে শুধু যন্ত্র তৈরি করাই বড় ব্যবসা নয়; সেই যন্ত্র চালানোর সফটওয়্যারের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব।
উইন্ডোজ, ইন্টারনেট ও বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকা
১৯৮৫ সালে মাইক্রোসফট উইন্ডোজের প্রথম সংস্করণ প্রকাশ করে। এমএস-ডসের কমান্ডভিত্তিক ব্যবস্থার বদলে উইন্ডোজে পর্দায় বিভিন্ন ছবি, আইকন ও মেনুর মাধ্যমে কম্পিউটার ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য কম্পিউটার পরিচালনা তুলনামূলক সহজ হয়ে ওঠে। উইন্ডোজের প্রথম সংস্করণ খুব বেশি সাফল্য না পেলেও উইন্ডোজ ৩.০ এবং বিশেষ করে ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত উইন্ডোজ ৯৫ মাইক্রোসফটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ব্যক্তিগত কম্পিউটারের ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং উইন্ডোজ হয়ে ওঠে বিশ্বের বহুল ব্যবহৃত অপারেটিং সিস্টেমগুলোর একটি।
ইন্টারনেটের সম্ভাবনাও গেটস দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন। ১৯৯৫ সালে মাইক্রোসফটের কর্মীদের উদ্দেশে লেখা একটি স্মারকে তিনি ইন্টারনেটকে বিশাল জোয়ারের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই প্রযুক্তি কম্পিউটার শিল্পের প্রচলিত ব্যবসায়িক কাঠামোকে বদলে দিতে পারে। মাইক্রোসফটকে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে।
গেটসের ব্যক্তিগত সম্পদও এ সময় দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৮৬ সালে মাইক্রোসফট শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ১৯৮৭ সালে, মাত্র ৩১ বছর বয়সে, গেটস ফোর্বসের বিলিয়নিয়ার তালিকায় স্থান পান। পরবর্তী বহু বছর তিনি বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
২০০০ সালে তিনি মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহীর পদ ছেড়ে স্টিভ বালমারের হাতে দায়িত্ব তুলে দেন। তবে চেয়ারম্যান ও প্রধান সফটওয়্যার স্থপতি হিসেবে কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ২০০৮ সালে তিনি দৈনন্দিন পূর্ণকালীন কাজ থেকে সরে আসেন। ২০১৪ সালে চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন এবং ২০২০ সালের মার্চে পরিচালনা পর্ষদ থেকেও বিদায় নেন। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গেটসের সাফল্য শুধু নতুন সফটওয়্যার তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ অনুমান করা, বাজারের সুযোগ চিহ্নিত করা এবং সফটওয়্যারকে ব্যাপকভাবে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
একচেটিয়া ব্যবসার মামলা: কাঠগড়ায় মাইক্রোসফট
মাইক্রোসফটের দ্রুত উত্থানের পাশাপাশি কোম্পানিটির ব্যবসায়িক আচরণ নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কোম্পানিটি নিজের প্রভাব ব্যবহার করছে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়তে থাকে। ১৯৯৮ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এবং একাধিক অঙ্গরাজ্য মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগে মামলা করে। অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্র ছিল উইন্ডোজের সঙ্গে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ব্রাউজারের সংযুক্তি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী নেটস্কেপের মতো ব্রাউজারের বাজারে প্রবেশ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত করার চেষ্টা।
২০০০ সালে বিচারক টমাস পেনফিল্ড জ্যাকসন রায় দেন যে মাইক্রোসফট ব্যক্তিগত কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেমের বাজারে নিজের একচেটিয়া ক্ষমতা অবৈধভাবে বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। কোম্পানিকে দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানে ভাগ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০০১ সালে আপিল আদালত ওই বিভাজনসংক্রান্ত নির্দেশ বাতিল করে এবং মামলার কিছু অংশ পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠায়। একই বছর যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও মাইক্রোসফট একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। ফলে কোম্পানিটি অক্ষত থাকে, যদিও তার ব্যবসায়িক আচরণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়।
এই মামলা প্রযুক্তি শিল্পে প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবন এবং বাজারে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের জন্ম দেয়। গেটসের জবানবন্দির ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর আচরণও সংবাদমাধ্যমে সমালোচিত হয়।
মাইক্রোসফটের শুরুর দিনগুলো নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই ও প্রতিবেদনে গেটসকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যিনি নিজের এবং সহকর্মীদের কাছে অত্যন্ত উচ্চ প্রত্যাশা রাখতেন। কাজের ভুল নিয়ে তিনি কখনো কখনো কঠোর ও রূঢ় ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানাতেন বলেও বর্ণনা রয়েছে। একদিকে তিনি ছিলেন সফল উদ্যোক্তা, যিনি ব্যক্তিগত কম্পিউটারকে সাধারণ মানুষের নাগালে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অন্যদিকে তাঁর নেতৃত্বাধীন কোম্পানির প্রতিযোগিতামূলক আচরণ নিয়ে গুরুতর আইনি প্রশ্নও উঠেছে। গেটসের উত্তরাধিকার মূল্যায়ন করতে গেলে এই দুই দিকই বিবেচনায় রাখতে হয়।
ধনকুবের থেকে দানবীর
মাইক্রোসফটের ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি গেটসের জীবনে আরেকটি বড় অধ্যায় শুরু হয় দাতব্য কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। ১৯৯৪ সালে তিনি নিজের নামে একটি ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন। ২০০০ সালে স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসের সঙ্গে যৌথভাবে গড়ে ওঠে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন।
ফাউন্ডেশনটির প্রধান কাজের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, শিশুদের টিকাদান, কৃষি, পুষ্টি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। ২০০৬ সালে বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট ফাউন্ডেশনকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। এতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। একই বছর গেটস মাইক্রোসফটের দৈনন্দিন কাজ থেকে সরে এসে দাতব্য কর্মকাণ্ডে বেশি সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।
২০১০ সালে গেটস ও বাফেট ‘গিভিং প্লেজ’ উদ্যোগ চালু করেন। এর মাধ্যমে বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের জীবদ্দশায় অথবা মৃত্যুর পর তাঁদের সম্পদের সিংহভাগ দাতব্য কাজে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে উৎসাহিত করা হয়। ফাউন্ডেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ বৈশ্বিক পোলিও নির্মূল উদ্যোগে সহায়তা করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, বিভিন্ন দেশের সরকার এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে মিলে এই উদ্যোগ পরিচালিত হয়। ১৯৮৮ সালের তুলনায় বিশ্বে বন্য পোলিও ভাইরাসের সংক্রমণ ৯৯ শতাংশেরও বেশি কমেছে। তবে রোগটি পুরোপুরি নির্মূল হয়নি; আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে বন্য পোলিও ভাইরাসের সংক্রমণ এখনো জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ, শিশুদের টিকাদান, টিকা জোট গাভির সহায়তা এবং কৃষি ও পুষ্টি উন্নয়নেও ফাউন্ডেশন অর্থায়ন করেছে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে টিকাদান ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ফাউন্ডেশন ঘোষণা করে, ২০৪৫ সালের মধ্যে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে পরবর্তী দুই দশকে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করা হবে। গেটস জানান, মানুষের জীবন রক্ষা ও উন্নয়নে আরও দ্রুত সম্পদ কাজে লাগানোই এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য। ঘোষণাটি ফাউন্ডেশনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতেও প্রকাশিত হয়। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের ঘোষণা
তবে গেটসের দাতব্য কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি না হয়েও একজন ধনকুবের কীভাবে বিপুল অর্থের মাধ্যমে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিক্ষানীতিতে প্রভাব ফেলতে পারেন, তা নিয়ে গবেষক ও অধিকারকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় টিকার মেধাস্বত্ব এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর নিয়ে বিতর্কেও গেটসের অবস্থান সমালোচিত হয়েছিল। শিক্ষা খাতে তাঁর অর্থায়নে পরিচালিত কিছু উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। গেটস নিজেও কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও ভুল সিদ্ধান্তের কথা স্বীকার করেছেন।
জলবায়ু সংকটে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের পক্ষে
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ও দাতব্য কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি গেটস জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও বিনিয়োগ করেছেন। ২০০৮ সালে তাঁর সমর্থনে যাত্রা শুরু করে টেরাপাওয়ার, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। ২০১৫ সালে তিনি ব্রেকথ্রু এনার্জি নামে একটি বিনিয়োগ উদ্যোগ গড়ে তোলেন। এর লক্ষ্য ছিল পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়ক প্রযুক্তির উন্নয়নকে উৎসাহিত করা।
২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ‘হাউ টু অ্যাভয়েড আ ক্লাইমেট ডিজাস্টার’-এ গেটস যুক্তি দেন, কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে শুধু ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। বিদ্যুৎ, শিল্প, পরিবহন, কৃষি ও নির্মাণ খাতে নতুন প্রযুক্তি এবং বড় পরিসরের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
তবে তাঁর জলবায়ুবিষয়ক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমির মালিকানা এবং ব্যক্তিগত জেট ব্যবহারের মতো বিষয় তাঁর পরিবেশগত অঙ্গীকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
গেটসের বক্তব্য, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন অপরিহার্য। সমালোচকদের প্রশ্ন, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান ভোগের ধরন, সম্পদের অসম বণ্টন এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোও যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে কি না।
বিচ্ছেদ, এপস্টিন-বিতর্ক ও ভাবমূর্তির ধাক্কা
২০২১ সালে বিল গেটস ও মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস তাঁদের ২৭ বছরের বিবাহিত জীবনের অবসান ঘটান। বিচ্ছেদের পর গেটসের ব্যক্তিজীবন এবং তাঁর কিছু সম্পর্ক নিয়ে জনসমক্ষে আরও আলোচনা শুরু হয়। ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সিবিএস নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে অতীতের যোগাযোগ নিয়ে গেটস তাঁর ফাউন্ডেশনের কর্মীদের এক সভায় দুঃখ প্রকাশ করেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনের বরাতে সিবিএস জানায়, গেটস এপস্টিনের সঙ্গে সময় কাটানোকে বড় ভুল বলে উল্লেখ করেন এবং এর ফলে যাঁরা বিব্রত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের কাছে ক্ষমা চান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেটস জানান, ২০১১ সালে এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং ২০১৪ সাল পর্যন্ত তাঁদের একাধিকবার দেখা হয়েছে। এপস্টিনের অপরাধের বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না বলে গেটস দাবি করেছেন। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে অর্থ সংগ্রহের সম্ভাবনার কথা ভেবেই তিনি এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। সিবিএসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই সভায় গেটস বিবাহিত অবস্থায় তাঁর দুটি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। তবে এপস্টিন-সম্পর্কিত নথিতে থাকা কিছু অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। গেটস কোনো অবৈধ কাজ করার বা এপস্টিনের অপরাধ প্রত্যক্ষ করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গেটস ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, সম্ভাব্য দাতব্য অর্থায়নের আশায় প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মী এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, কোনো তহবিল গঠিত হয়নি এবং ফাউন্ডেশন এপস্টিনকে কোনো অর্থ দেয়নি বা তাঁকে কর্মী হিসেবেও নিয়োগ করেনি। এই বিতর্ক গেটসের জনপরিচিতি ও দাতব্য ভাবমূর্তিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। তাঁর সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসও এপস্টিন-সম্পর্কিত খবর প্রকাশের পর ব্যক্তিগত কষ্টের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।
আশাবাদী গেটস কেন এখন শঙ্কিত?
ব্যবসা, দাতব্য কর্মকাণ্ড ও জলবায়ু প্রযুক্তির পর গেটসের বর্তমান মনোযোগের অন্যতম বড় ক্ষেত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। ২০২৩ সালের মার্চে নিজের ব্লগ ‘গেটস নোটস’-এ প্রকাশিত ‘দ্য এজ অব এআই হ্যাজ বিগান’ শীর্ষক লেখায় তিনি এআইকে ব্যক্তিগত কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও মুঠোফোনের মতোই মৌলিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
সেই লেখায় গেটস বলেন, তাঁর জীবনে মাত্র দুবার এমন প্রযুক্তি দেখেছেন, যা তাঁকে বিপ্লবী পরিবর্তনের সম্ভাবনা সম্পর্কে গভীরভাবে আশাবাদী করেছে। প্রথমটি ছিল ১৯৮০ সালে গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেসের সঙ্গে পরিচয়; দ্বিতীয়টি ২০২২ সালে ওপেনএআইয়ের এআই মডেল ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা। তবে ২০২৬ সালে এসে এআই নিয়ে তাঁর বক্তব্যে উদ্বেগের মাত্রা বেড়েছে। ২৬ আগস্ট প্রকাশিত প্রায় ছয় হাজার শব্দের একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, এআইয়ের সুফল যেমন বিপুল হতে পারে, তেমনি এর নেতিবাচক প্রভাব সামলানোর জন্য সরকার ও সমাজের হাতে সময় খুব কম।
গেটসের উদ্বেগের একটি বড় কারণ কর্মসংস্থান। তাঁর মতে, এআই আইন, গ্রাহকসেবা, চিকিৎসা, সফটওয়্যার এবং উৎপাদনসহ বহু ক্ষেত্রে মানুষের কাজ করতে সক্ষম হবে। অতীতের প্রযুক্তিগত বিপ্লবের তুলনায় এই পরিবর্তন অনেক দ্রুত ঘটতে পারে। ফলে নতুন কাজ তৈরি হলেও সঠিক নীতি ও প্রস্তুতি না থাকলে হারিয়ে যাওয়া চাকরির তুলনায় নতুন কাজের সংখ্যা কম হতে পারে। তিনি মনে করেন, এআইয়ের ঝুঁকি শুধু চাকরি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাইবার হামলা, প্রতারণা, বিপজ্জনক প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং শিশুদের শেখা ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। এআইয়ের দ্রুত উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইন, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
গেটসের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে কিছু পেশা মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখা। তিনি এই ধারণার নাম দিয়েছেন ‘হিউম্যান রিজার্ভড’। যেমন, বয়স্ক মানুষের পরিচর্যা, চিকিৎসার কঠিন সংবাদ জানানো কিংবা এমন কিছু কাজ, যেখানে মানবিক অনুভূতি ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ—এসব ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা বজায় রাখার কথা বলেছেন তিনি। এ ছাড়া এআই ও রোবটের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করব্যবস্থার পরিবর্তনের কথাও বলেছেন গেটস। তাঁর যুক্তি, কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মী নিয়োগ করলে বেতনের ওপর কর দেয়, কিন্তু যন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে করব্যবস্থা অনেক সময় স্বয়ংক্রিয়তার দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করে। এআই ও রোবটের ব্যবহার থেকে রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থা করা গেলে কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষায় অর্থ জোগানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এসব প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। প্রযুক্তি শিল্পের অনেকেই মনে করেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ উদ্ভাবনের গতি কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে শ্রমবাজারের পরিবর্তন, আয়ের বৈষম্য এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় নীতিগত প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা চলছে। গেটসের বক্তব্যে এখন একটি নতুন উপলব্ধি স্পষ্ট: প্রযুক্তি যত দ্রুত উন্নত হবে, সমাজকে তত দ্রুত তার প্রভাব মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এআইয়ের সম্ভাবনাকে অস্বীকার না করেও তিনি চান, এর সুবিধা যেন মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।
সাফল্যের উত্তরাধিকার, বিতর্কের ছায়া
বিল গেটসের জীবন একাধিক পরিচয়ের সমন্বয়। তিনি ব্যক্তিগত কম্পিউটার বিপ্লবের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা, সফটওয়্যার শিল্পের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, বিশ্বের অন্যতম বড় দাতব্য উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা এবং নতুন প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সক্রিয় আলোচক। একই সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক কৌশল, একচেটিয়া ক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং দাতব্য অর্থের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলোও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
গেটসের সাফল্যের গল্প শুধু প্রতিভা ও কঠোর পরিশ্রমের গল্প নয়; এটি প্রযুক্তির সুযোগ চিহ্নিত করা, সঠিক সময়ে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বাজারের কাঠামো বদলে দেওয়ার কাহিনি। আবার তাঁর জীবন দেখায়, বিপুল সম্পদ ও প্রযুক্তিগত সাফল্য একজন মানুষকে জনসমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না। হার্ভার্ডের পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে শুরু করা সেই তরুণের হাতে গড়া মাইক্রোসফট আজও প্রযুক্তি জগতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু গেটসের জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আর শুধু কম্পিউটার বা সফটওয়্যারের নয়। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির শক্তি কীভাবে মানুষের জীবন উন্নত করবে, আর সেই শক্তির ঝুঁকি ও প্রভাবের দায়িত্ব কে নেবে? এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে গেটসের বর্তমান উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে সেই প্রশ্নই।
তথ্যসূত্র: ব্রিটানিকা, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, সিবিএস নিউজ, বায়োগ্রাফি ডটকম, স্টাডি ডটকম, ইনক ডটকম, ব্লিপ ফিন্যান্স, গেটস ফাউন্ডেশন, গেটস নোটস, করপোরেট ফিন্যান্স ইনস্টিটিউট, বার্কলে ল স্কুল


