শিল্প, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে বদলে যাচ্ছে হিউস্টনের অর্থনৈতিক চিত্র; বাড়ছে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
সুরাঙ্গন নিউজ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিউস্টনে নতুন করে বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের নানা উদ্যোগ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। জ্বালানি, উৎপাদনশিল্প, ওষুধ ও বায়োটেকনোলজি, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট এবং মহাকাশ গবেষণাসংশ্লিষ্ট খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের ফলে বৃহত্তর হিউস্টন অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বিনিয়োগের প্রভাব শুধু বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; স্থানীয় ব্যবসা, নির্মাণশিল্প, পরিবহন, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা এবং দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ওষুধ ও বায়োটেকনোলজি শিল্পে এলি লিলির ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প

হিউস্টনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেনারেশন পার্কে আন্তর্জাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলি লিলি (Eli Lilly) প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে একটি বৃহৎ ওষুধ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নির্মাণপর্বে প্রায় ৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি স্থায়ীভাবে প্রায় ৬০০টি চাকরি সৃষ্টির প্রত্যাশা রয়েছে।
এই প্রকল্প হিউস্টন অঞ্চলে ওষুধ উৎপাদন, বায়োটেকনোলজি এবং জীবনবিজ্ঞানভিত্তিক শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, রসায়ন, জীবপ্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়নে সেন্টারপয়েন্টের বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা

হিউস্টন অঞ্চলে জনসংখ্যা, শিল্পকারখানা এবং ডেটা সেন্টারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সেন্টারপয়েন্ট এনার্জি (CenterPoint Energy) বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও অবকাঠামো উন্নয়নে অতিরিক্ত প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
২০৩০ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির সম্ভাব্য মোট মূলধনী বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৮.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের শিল্প ও প্রযুক্তিগত চাহিদা পূরণে এ বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। তবে অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যয় এবং গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিলের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
শিল্প ও গুদামজাতকরণ খাতে রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ

হিউস্টনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত নর্থউডস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ২.৭ মিলিয়ন বর্গফুটের শিল্প ও গুদামজাতকরণ কমপ্লেক্স নতুন বিনিয়োগকারীদের হাতে গেছে। ৬৪টি ভবন নিয়ে গঠিত এই শিল্পাঞ্চলটি ইউএস হাইওয়ে ২৯০ এবং বেল্টওয়ে ৮-এর কাছাকাছি অবস্থিত।
প্রায় ৯৮ শতাংশ জায়গা ভাড়াটিয়াদের দখলে থাকা এই কমপ্লেক্সের লেনদেন বৃহত্তর হিউস্টনের শিল্পভিত্তিক রিয়েল এস্টেট বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের প্রতিফলন। উৎপাদন, পণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার সম্প্রসারণে এ ধরনের শিল্প অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
জ্বালানি খাতে করপোরেট মালিকানায় পরিবর্তন

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি শিল্পে চলমান পুনর্গঠন ও করপোরেট লেনদেনের অংশ হিসেবে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলারের একটি রিফাইনারি অধিগ্রহণের খবর সামনে এসেছে। হিউস্টনভিত্তিক জ্বালানি ব্যবসার জন্য এ ধরনের লেনদেন গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি নীতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়িক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করছে। হিউস্টনের অর্থনীতিতে তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের দীর্ঘদিনের ভূমিকার কারণে এসব পরিবর্তন স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানেও প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ

হিউস্টন অঞ্চলে উৎপাদনশিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের চাহিদা বাড়ায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রশিক্ষণভিত্তিক সহযোগিতার গুরুত্ব বাড়ছে। বিশেষ করে অটোমোবাইল উৎপাদন, শিল্প প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি পরিচালনা এবং কারিগরি দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
টেসলাসহ বিভিন্ন উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনায় রেখে দক্ষ কর্মী তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণ কর্মসূচি তরুণ প্রজন্ম এবং কর্মজীবনে নতুনভাবে প্রবেশ করতে আগ্রহীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।
মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তিতে হিউস্টনের ভবিষ্যৎ

নাসার জনসন স্পেস সেন্টারসহ বিভিন্ন মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতির কারণে হিউস্টন দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মহাকাশ প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা ও জীবনবিজ্ঞানভিত্তিক শিল্পের বিকাশ হিউস্টনের অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করতে পারে।
প্রবাসী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় ব্যবসায়ীদের জন্য কী সম্ভাবনা?
হিউস্টনের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হতে পারে। নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ, পরিবহন, খাদ্যসেবা, রিয়েল এস্টেট, পেশাগত পরামর্শ, প্রযুক্তি এবং ছোট ও মাঝারি ব্যবসার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন বাজার সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই সঙ্গে বিজ্ঞান, রসায়ন, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবায় শিক্ষিত তরুণদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক চাকরির সুযোগ বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, হিউস্টনের অর্থনীতি এখন শুধু তেল ও গ্যাস শিল্পের ওপর নির্ভরশীল নয়; উৎপাদন, প্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং মহাকাশ গবেষণাও এর ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এসব বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর।


