২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, ২৩৪ ম্যাচ, ১৪৬ গোল- পর্তুগালের ৭ নম্বর জার্সিকে অমর করে বিদায় নিচ্ছেন এক কিংবদন্তি
সুরাঙ্গন নিউজ ডেস্ক: কিছু বিদায় শুধু একজন মানুষের প্রস্থান নয়, একটি যুগের অবসান। কিছু শূন্যস্থান কখনোই পূরণ হয় না। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও তেমনই এক মুহূর্ত। পর্তুগালের লাল-সবুজ জার্সিতে আর দেখা যাবে না সেই চিরচেনা ৭ নম্বরকে। গ্যালারিতে আর প্রতিধ্বনিত হবে না তাঁর গোলের পর সেই বিখ্যাত ‘সিউ’ উদ্যাপন। বিশ্বফুটবল হারাতে চলেছে এক অসাধারণ অধ্যায়ের নায়ককে।

৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বার্তার মাধ্যমে পর্তুগাল জাতীয় দলকে বিদায় জানান ৪১ বছর বয়সী এই ফুটবল মহাতারকা। দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সি এবার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে।
সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। কারণ এই জার্সি শুধু একটি পোশাক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের ২৩ বছরের সংগ্রাম, সাফল্য, স্বপ্ন এবং কোটি মানুষের ভালোবাসা।
রেকর্ডের নামই যখন রোনাল্ডো

পরিসংখ্যানের পাতায় রোনাল্ডো এক বিস্ময়কর অধ্যায়। ২৩৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১৪৬ গোল। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ড তাঁর দখলে। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে প্রতিটিতেই গোল করেছেন তিনি। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর গোলসংখ্যা ১১।
তাঁর নেতৃত্বেই ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপাও ওঠে পর্তুগালের হাতে।
তবে রোনাল্ডোর কৃতিত্বকে শুধু গোল, ট্রফি কিংবা রেকর্ড দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বারবার ফিরে আসার অদম্য মানসিকতা।
মাদেইরার ছোট্ট ঘর থেকে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন

পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম। আর্থিক অনটন, সীমিত সুযোগ এবং জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছেন বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ আসনে।
শৈশবের সেই ছেলেটি একদিন বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ফুটবল তারকাদের একজন হয়ে উঠবেন, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেননি। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের সামর্থ্যের ওপর অবিচল বিশ্বাস তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
স্পোর্টিং লিসবন থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ থেকে জুভেন্টাস – প্রতিটি অধ্যায়েই রেখে গেছেন নিজের স্বাক্ষর। ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়েও হয়ে উঠেছেন পর্তুগালের সবচেয়ে বড় পরিচয়গুলোর একটি।
সমালোচনা এসেছে, ব্যর্থতা এসেছে, আঘাত এসেছে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি ফিরে এসেছেন নতুন উদ্যমে। তাঁর জীবন যেন বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে – প্রতিভা মানুষকে সম্ভাবনা দেয়, কিন্তু অধ্যবসায়ই তাকে কিংবদন্তি করে তোলে।
বিশ্বকাপের আক্ষেপ, তবু অসম্পূর্ণ নন রোনাল্ডো

নিন্দুকেরা হয়তো মনে করিয়ে দেবেন, বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটি কখনো হাতে তোলা হয়নি তাঁর। ২০২৬ বিশ্বকাপেও শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেয় পর্তুগাল। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দলটির বিশ্বকাপ অভিযান।
কিন্তু একটি বিশ্বকাপ ট্রফি না জিতলেই কি একজন ফুটবলারের মহত্ত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়?
রোনাল্ডোর ক্ষেত্রে উত্তরটি সহজ নয়। কারণ তিনি শুধু নিজের জন্য খেলেননি; একটি দেশকে বিশ্বফুটবলের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দীর্ঘ যাত্রার অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন।
তাঁর গোলের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়েছে পর্তুগাল। তাঁর পরাজয়ে কেঁদেছে সমর্থকেরা। আর তাঁর প্রত্যাবর্তনে নতুন করে স্বপ্ন দেখেছে অসংখ্য তরুণ ফুটবলার।

৭ নম্বর জার্সির শূন্যস্থান
আবারও মাঠে নামবে পর্তুগাল। নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা লড়বেন দেশের হয়ে। নতুন তারকারা নিজেদের জায়গা করে নেবেন। কিন্তু গ্যালারির চোখ হয়তো বারবার খুঁজবে সেই পরিচিত মুখটিকে।
খুঁজবে ৭ নম্বর জার্সি। খুঁজবে গোলের পর দুই হাত প্রসারিত করে শূন্যে লাফিয়ে ওঠা সেই মানুষটিকে। খুঁজবে তাঁর কণ্ঠের সেই উদ্যাপন ‘সিউ’।
ফুটবলে নতুন তারকা আসবেন, নতুন রেকর্ড তৈরি হবে। কিন্তু রোনাল্ডো যে সময়, যে আবেগ এবং যে পরিচয় তৈরি করেছেন, তা সহজে পুনরাবৃত্তি হওয়ার নয়।
তবে তাঁর ফুটবলজীবনের এখানেই শেষ নয়। জাতীয় দলকে বিদায় জানালেও ক্লাব ফুটবলে আল নাসরের হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন তিনি। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ১,০০০ গোলের ঐতিহাসিক মাইলফলক ছোঁয়ার স্বপ্নও এখনো বাকি। সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবে তাঁর ক্যারিয়ার গোলসংখ্যা ৯৮৫।

বিদায় নয়, এক নতুন অধ্যায়ের শুরু
রোনাল্ডোর গল্প আসলে শুধু ফুটবলের গল্প নয়। এটি নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার গল্প। এটি ব্যর্থতার পর উঠে দাঁড়ানোর গল্প। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি বারবার প্রমাণ করেছেন—বয়স, সমালোচনা কিংবা প্রতিকূলতা কোনো কিছুই অদম্য ইচ্ছাশক্তির চেয়ে বড় নয়।
একদিন ফুটবল মাঠে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে না, ৭ নম্বর জার্সি গায়ে আর দৌড়াবেন না তিনি। কিন্তু রেকর্ডের পাতায়, ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে এবং আগামী প্রজন্মের স্বপ্নে বেঁচে থাকবেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।

সময় এগিয়ে যাবে। ফুটবল বদলাবে। নতুন মহাতারকার জন্ম হবে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যাবে—রোনাল্ডোর মতো আরেকজন আসবেন কবে?
পর্তুগালের হয়ে ২৩ বছরের মহাকাব্যের পর্দা নামছে। কিন্তু কিংবদন্তিদের গল্প কখনো শেষ হয় না।
বিদায়, ক্যাপ্টেন! বিদায়, ৭ নম্বর!
তোমার গোলের হিসাব হয়তো একদিন কেউ ছাড়িয়ে যাবে, কিন্তু কোটি মানুষের হৃদয়ে তোমার জায়গা কেড়ে নেওয়া সহজ হবে না।


