আল জাজিরা অবলম্বনে
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কোম্পানিগুলোতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও সাধারণ কর্মীদের আয়ের ব্যবধান ২০২৫ সালে আরও বেড়েছে। এই বৈষম্যের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ইলন মাস্ক। টেসলার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জন্য মাস্কের মোট পারিশ্রমিকের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৫৮.৩ বিলিয়ন ডলার, যা টেসলার মধ্যম সারির কর্মীর পারিশ্রমিকের প্রায় ২৫ লাখ গুণ।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ১৫৮.৩ বিলিয়ন ডলার মাস্কের হাতে পাওয়া নগদ অর্থ নয়। এর বড় অংশ ছিল শেয়ারভিত্তিক পুরস্কারের হিসাব করা মূল্য। Tesla জানিয়েছে, ২০২৫ সালে মাস্ক সংশ্লিষ্ট কর্মদক্ষতা ও শেয়ারমূল্যের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেননি। ফলে ওই পুরস্কারের অর্থ তিনি তখন বাস্তবে অর্জন করেননি।
সিইও-কর্মী বেতন ব্যবধান ৩১২ গুণ
শ্রমিক সংগঠনগুলোর জোট এএফএল-সিআইও-র ২০২৬ সালের Executive Pay watch প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইলন মাস্ককে হিসাবের বাইরে রাখলে ২০২৫ সালে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকভুক্ত কোম্পানিগুলোর সিইওরা গড়ে তাঁদের মধ্যম সারির কর্মীর চেয়ে ৩১২ গুণ বেশি পারিশ্রমিক পেয়েছেন। ২০২৪ সালে এই অনুপাত ছিল ২৮৫ গুণ।
২০২৫ সালে এসব কোম্পানির সিইওদের গড় পারিশ্রমিক ছিল ২ কোটি ২৮ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি। কিন্তু মাস্কের ১৫৮.৩ বিলিয়ন ডলারের হিসাব যুক্ত করলে গড় সিইও পারিশ্রমিক অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে প্রায় ৩৪ কোটি ১০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। সে ক্ষেত্রে সিইও ও কর্মীর গড় পারিশ্রমিকের ব্যবধান দাঁড়ায় ৫,৩৮৭ গুণ।
অর্থাৎ, মাস্কের অস্বাভাবিক বড় শেয়ারভিত্তিক পুরস্কার পুরো পরিসংখ্যানকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।
টেসলার আর্থিক চিত্র
টেসলা ২০২৫ সালে মোট ৯৪.৮৩ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব করেছে, যা ২০২৪ সালের ৯৭.৬৯ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কম। একই সময়ে কোম্পানির নিট আয় কমে ৩.৭৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
ফলে টেসলার ২০২৫ সালের রাজস্বের তুলনায় মাস্কের ঘোষিত ১৫৮.৩ বিলিয়ন ডলারের grant-date fair value বেশি কিন্তু এটিকে মাস্কের হাতে পাওয়া অর্থের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা বিভ্রান্তিকর। কারণ ওই পুরস্কার ভবিষ্যতের কর্মদক্ষতা ও শেয়ারমূল্যের নির্দিষ্ট শর্তের সঙ্গে যুক্ত।
বিভিন্ন কোম্পানিতে বড় বেতন বৈষম্য
সিইও ও কর্মীদের পারিশ্রমিকের ব্যবধান শুধু টেসলাতেই নয়, অন্যান্য বড় কোম্পানিতেও ব্যাপক।
স্টারবাকসের সিইও ব্রায়ান নিকল ২০২৫ সালে প্রায় ৩ কোটি ৯৯ লাখ নয়, বরং ৩ কোটি ৯৯ লাখের কাছাকাছি নয়—প্রকৃত মোট পারিশ্রমিক ছিল ৩০.৯৯ মিলিয়ন ডলার পেয়েছেন। একই সময়ে কোম্পানির মধ্যম সারির কর্মীর বার্ষিক পারিশ্রমিক ছিল ১৭,২৭৯ ডলার। ফলে ব্যবধান দাঁড়ায় ১,৭৯৪ গুণ।
অ্যামাজনের সিইও অ্যান্ডি জ্যাসির ক্ষেত্রেও সিইও ও কর্মীর পারিশ্রমিকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান ছিল। ম্যাকডোনাল্ডসের সিইও ক্রিস কেম্পচিনস্কির ক্ষেত্রেও এই ব্যবধান এক হাজার গুণের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাস্কের সম্পদ ও SpaceX-এর আইপিও
২০২৬ সালের জুনে SpaceX-এর ঐতিহাসিক আইপিও মাস্কের সম্পদকে আরও বাড়িয়ে দেয়। SpaceX-এর শেয়ার ১৩৫ ডলার দরে আইপিও করা হয় এবং বাজারে লেনদেন শুরুর পর শেয়ারের মূল্য দ্রুত বাড়ে। এর ফলে মাস্ক বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে পরিচিত হন।
তবে এখানে “মাস্কের আয়” এবং “মাস্কের সম্পদ” এই দুটি বিষয় আলাদা। শেয়ারমূল্য বাড়ার কারণে তাঁর সম্পদের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও সেটি বার্ষিক বেতন বা নগদ আয় নয়।
ট্রাম্পের আয়ও বেড়েছে
এএফএল-সিআইওর বিশ্লেষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৫ সালের আয়ও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের হিসাবে, তাঁর আয় আগের বছরের তুলনায় ২৫৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এর বড় অংশ এসেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি-সম্পর্কিত ব্যবসা ও সম্পদ থেকে।
প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, এই আয় যুক্তরাষ্ট্রের একজন মধ্যম সারির কর্মীর আয়ের প্রায় ৪৩ হাজার গুণ।
বাড়ছে আয়বৈষম্যের উদ্বেগ
সিইওদের পারিশ্রমিক দ্রুত বাড়লেও সাধারণ কর্মীদের আয় একই গতিতে বাড়ছে না। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যম কর্মীর বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ৬৯,৭৭০ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ বেশি। বিপরীতে, সিইওদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধির হার ছিল অনেক বেশি।
অর্থনীতিবিদ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর একটি বড় উদ্বেগ হলো, অতিরিক্ত নির্বাহী পারিশ্রমিক কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি শেয়ারমূল্য বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করতে পারে। এর ফলে কর্মীদের মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের মতো বিষয় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ইলন মাস্কের ২০২৫ সালের পারিশ্রমিকের হিসাব এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। তবে একই সঙ্গে মনে রাখা জরুরি ১৫৮.৩ বিলিয়ন ডলার ছিল Tesla-এর হিসাব করা শেয়ারভিত্তিক পুরস্কারের মূল্য, মাস্কের হাতে পাওয়া নগদ বেতন নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট জগতে সিইও ও কর্মীদের আয়ের এই ক্রমবর্ধমান ব্যবধান তাই শুধু একজন ব্যক্তির পারিশ্রমিকের প্রশ্ন নয়; এটি করপোরেট গভর্ন্যান্স, কর্মীদের মজুরি এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে চলমান বিতর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।


