নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান বিপর্যয়ের এক মাস কেটে গেলেও এখনও কাটেনি নিখোঁজদের অপেক্ষা। উদ্ধার হয়েছে ১৪৫১টি দেহ। শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১১২টি। এখনও নিখোঁজ ৫২৮৫ জন। নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের ৩৭ জন।
সুরাঙ্গন নিউজ ডেস্ক: নেপালের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) তথ্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ের পর এখনও পর্যন্ত ১৩ হাজার ৭৯৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ২১টি ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন ১১১৩ জন। নুয়াকোটে ১৮৭ জন, রসুয়ায় ৮০৫ জন এবং ধাডিংয়ের বিভিন্ন ত্রাণশিবিরে ১২১ জন রয়েছেন।

নিখোঁজ পশ্চিমবঙ্গের ৩৭
নেপালে এখনও নিখোঁজ পশ্চিমবঙ্গের ৩৭ জন বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে ৩২ জন ‘চলো যাই’ নামে একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে নেপালে গিয়েছিলেন। ওই দলের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন প্রয়াত তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ের পুত্রবধূ শর্মিষ্ঠাও।
‘চলো যাই’-এর কর্ণধার দিব্যজ্যোতি বসু জানিয়েছেন, ৩২টি পরিবারের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে নেপাল সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনও কারও সন্ধান পাওয়া যায়নি।
১৪৫৩ মৃত, শনাক্ত মাত্র ১১২
উদ্ধার হওয়া ১৪৫১টি দেহের পাশাপাশি আরও দু’জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁদের মৃত্যু হয়। ফলে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৫৩। তবে শনাক্ত করা গিয়েছে মাত্র ১১২টি দেহ।
দীর্ঘ সময় জলে থাকার কারণে অধিকাংশ দেহ বিকৃত হয়ে গিয়েছে। অনেক দেহ পচে যাওয়ায় চেহারা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ডিএনএ পরীক্ষার উপরেই নির্ভর করছে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, মৃতদেহ ও দেহাবশেষ থেকে ১৩২৯টি ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নিখোঁজদের পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে আরও ২০২৯টি নমুনা। শনাক্ত না হওয়া ১৪২১টি দেহের বিস্তারিত তথ্য নেপাল পুলিশের ওয়েবসাইটে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
কেন এত কঠিন শনাক্তকরণ?

মর্গে বিপুল সংখ্যক দেহ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব না হওয়ায় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর দেহগুলি নিরাপদ স্থানে সমাহিত করা হয়েছে। নমুনাগুলি সংরক্ষণ করে রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কোনও নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিল পাওয়া গেলে সেই অনুযায়ী দেহ শনাক্ত করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
২৬ অগস্টের সেই ভয়াবহ বিপর্যয়
গত ২৬ অগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বান নেমে আসে। হিমালয়ের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে কাদা ও জলের প্রবল স্রোত ভোটেকোশী নদী ধরে নেমে আসে দক্ষিণের দিকে। স্রোতের তোড়ে ভেসে যায় বহু ঘরবাড়ি, গাড়ি, রাস্তা ও সেতু। ক্ষতিগ্রস্ত হয় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও। চিনের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতেও এই বন্যায় ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৫০০-র বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ।
ভেঙেছে রাস্তা, সেতু– চলছে পুনর্গঠন
বিপর্যয়ের এক মাস পরেও নেপালের বহু এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। রসুয়া ও ধাডিংয়ের মধ্যে প্রায় ৪০ কিলোমিটার রাস্তা এবং ৪১টি সেতু জলের তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নুয়াকোট ও রসুয়ার মধ্যে যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন।
তৈরি হচ্ছে অস্থায়ী রাস্তা ও সেতু। নেপাল সেনার সহায়তায় দেবীঘাটের কাছে একটি অস্থায়ী সেতু তৈরি হওয়ায় গালছি-বিদুর সড়কে ফের যান চলাচল শুরু হয়েছে। বেত্রাবতীতেও অস্থায়ী সেতু তৈরির কাজ চলছে। সিয়াব্রুবেসিতেও সেতু নির্মাণ করছে সরকার। তবে সিয়াব্রুবেসি থেকে রসুয়াগাধী যাওয়ার মূল রাস্তা এখনও পুরোপুরি বন্ধ। অক্টোবরের মাঝামাঝি ওই পথে যান চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।

প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছনোই বড় চ্যালেঞ্জ
বিপর্যস্ত প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে ত্রাণ পৌঁছে দিতে হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং অস্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে প্রশাসনকে। ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আকাশপথে পরিবহণের ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় একই সময়ে সমস্ত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে চিলিম এবং আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গেও চলছে তল্লাশি। বন্যার পর ওই প্রকল্পগুলির বেশ কয়েকজন কর্মী নিখোঁজ হয়েছিলেন। উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যেই সেখান থেকে একাধিক দেহ উদ্ধার করেছে। নিখোঁজদের সন্ধান এখনও চলছে। তার মধ্যেই নতুন করে ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এক মাস পেরিয়েও তাই নেপালে শেষ হয়নি উদ্ধার অভিযান। একদিকে নিখোঁজদের সন্ধান, অন্যদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া – তিন দিকেই একসঙ্গে লড়াই চালাচ্ছে প্রশাসন।


