সুরাঙ্গন নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক: দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি বিরতির পর মানবজাতির চন্দ্রভ্রমণের নতুন অধ্যায় শুরু হলো নাসার (NASA) Artemis II মিশন। এটি আর্টেমিস প্রোগ্রামের প্রথম মানববাহী ফ্লাইট, যা ভবিষ্যতে চাঁদে অবতরণ ও মঙ্গল অভিযানের ভিত্তি তৈরি করবে।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার ‘আর্টেমিস ২’ চন্দ্রাভিযান গত ১ এপ্রিল শুরু হয়েছিল। চাঁদকে প্রদক্ষিণ করার লক্ষ্য নিয়ে চারজন নভোচারী ‘ওরিয়ন’ নামের মহাকাশযানে চড়ে যাত্রা শুরু করেন। উৎক্ষেপণের পর থেকে প্রতিটি মুহূর্তই আর্টেমিস ২ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে। এই অভিযানে অংশগ্রহণকারী রকেট, মহাকাশযান এবং নভোচারীদের অর্জিত সাফল্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের wildest imaginations-কেও (সবচেয়ে দুঃসাহসিক কল্পনাকেও) যেন ছাড়িয়ে গেছে।
১০ দিনব্যাপী এই অভিযানের প্রথম ছয় দিনে নভোচারীদের বহনকারী ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলটি ঠিক প্রত্যাশামাফিকই কাজ করতে দেখা গেছে। সম্ভবত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জনটি হলো ‘আর্টেমিস ২’-এর নভোচারীদের সক্ষমতার দৃঢ় প্রদর্শন; আর এই বিষয়টিই ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের প্রতি নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। যদিও তাঁরা এবার চাঁদের বুকে অবতরণ করেননি, তবুও পৃথিবী থেকে যাত্রা করে চাঁদের অপর পৃষ্ঠের এমন এক সুদূরবর্তী কক্ষপথে পৌঁছেছেন যেখানে এর আগে কোনো মানুষ পৌঁছায়নি।

প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে দু’বার এই উৎক্ষেপণ স্থগিত করা হয়েছিল। নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেন, “তারা এখন বুঝতে পেরেছেন যে এসএলএস (SLS)-এর মতো এত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল একটি রকেট প্রতি তিন বছরে একবার উৎক্ষেপণ করা সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে কার্যকর পন্থা নয়।”
এর আগে, ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে নাসা আর্টেমিস ১ মিশন পরিচালনা করেছিল। সেই মিশনে কোনো মানুষ ছিল না; কেবল একটি মহাকাশযান মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। নাসার প্রশাসকের মতে, সংস্থাটিকে প্রতিটি রকেটকে “শিল্পকর্ম” হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে এটিকে একটি নিয়মিত ও অপরিহার্য কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সবকিছুকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ১ এপ্রিল মহাকাশচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং জেরেমি হ্যানসেন চাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

অভিযানের প্রথম ছয় দিনের পর্যবেক্ষণ (সংক্ষেপে) : এই অভিযানটি আশাবাদীদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
রকেটের নিখুঁত কার্যকারিতা
উৎক্ষেপণের সময় প্রকৌশলীরা যেসব গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন সব ক্ষেত্রেই SLS রকেটটি ঠিক পরিকল্পনামাফিক কাজ করেছে। সর্বোচ্চ গতিশীল চাপ (peak dynamic pressure), মূল ইঞ্জিন বন্ধ হওয়া (cutoff) এবং বুস্টার বিচ্ছিন্নকরণ, সবকিছুই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
চাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রাপথে নির্ধারিত তিনটি গতিপথ সংশোধনের (course correction) মধ্যে দু’টি বাতিল করা হয়, কারণ মহাকাশযানটি এতটাই নিখুঁতভাবে এগোচ্ছিল যে এগুলোর প্রয়োজন হয়নি।
মহাকাশযানের অভ্যন্তরে জীবনযাত্রা
এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলের ভেতরে নভোচারীদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা এবং মানবদেহ ও মহাকাশযানের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা। তবে কিছু সমস্যা দেখা দেয়, বিশেষ করে শৌচাগার ব্যবস্থায় এবং পানি সরবরাহে ত্রুটি। ফলে নভোচারীদের সতর্কতামূলকভাবে পানি সাশ্রয় করতে হয়।
বর্তমানে প্রকৌশলীরা কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ ব্যবস্থা সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করছেন, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ভবিষ্যতে এই মহাকাশযান মানুষকে নিরাপদে চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।
বৈজ্ঞানিক অর্জন নাকি প্রচার?
এই অভিযানে প্রায় ৩৫টি ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নথিবদ্ধ করা হয়েছে এবং সূক্ষ্ম রঙের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। নভোচারীরা মহাকাশ থেকে একটি সূর্যগ্রহণও প্রত্যক্ষ করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পর্যবেক্ষণগুলোর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব সীমিত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস লিনটট মন্তব্য করেন, “আর্টেমিস মিশনের ছবিগুলোর শৈল্পিক মূল্য থাকলেও বৈজ্ঞানিক উপযোগিতা সীমিত।” এর কারণ হলো, এর আগেই চন্দ্রযান-৩ এবং চাং’ই-৬-এর মতো মিশন চাঁদের দক্ষিণ মেরু ও অপর পৃষ্ঠ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নমুনা সংগ্রহ করেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো ১৯৭০ সালের পর প্রথমবার মানুষ চাঁদের দূরবর্তী কক্ষপথে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
কঠিন পরীক্ষা
‘ওরিয়ন’ মহাকাশযান পৃথিবীতে ফিরে আসা ছিল কঠিন পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত ওরিয়ন প্রশান্ত মহাসাগরে স্প্ল্যাশ-ডাউনের মাধ্যমে অবতরণ করেছে। এটি ছিল একটি সফল অবতরণ।
বিশেষ করে অবতরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ, যেখানে গতিবেগ প্রায় ২৫,০০০ মাইল প্রতি ঘণ্টা। যা ‘আর্টেমিস ১’ মিশনে এই ধাপে হিট শিল্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
উপসংহার
এই মিশন নাসাকে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে রকেট উৎক্ষেপণকে নিয়মিত, কার্যকর ও ধারাবাহিক কর্মসূচি হিসেবে দেখা। ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ অবতরণ এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ‘আর্টেমিস ২’-এর সফল অগ্রগতি ভবিষ্যতের জন্য নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে।
‘ওরিয়ন’ ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে এটি মহাকাশে উড্ডয়ন ও চাঁদের কক্ষপথে কাজ করার জন্য সক্ষম। এটি কোনো সমাপ্তি নয় বরং চূড়ান্ত চন্দ্রাভিযানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক ধাপ।


