Some Populer Post

Latest News

হিউস্টনে স্তন ক্যানসার সচেতনতামূলক আলোচনা: প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসার ওপর গুরুত্বারোপ | ক্যানসার গবেষণায় নতুন দিশা: টিউমারে রোগপ্রতিরোধী কোষের প্রবেশ বুঝতে এআই (AI) প্রযুক্তি তৈরি করলেন গবেষকেরা | দুর্গাপূজা: সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িকতার উৎসব | যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দুর্গোৎসবের মহাধুম | হিউস্টনের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন বিতর্ক: HISD-র রাজ্য-নিয়ন্ত্রিত পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন, বাড়ছে শিক্ষার্থী সংকট ও বাজেটের চাপ | হিউস্টনে স্তন ক্যানসার সচেতনতামূলক আলোচনা: প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসার ওপর গুরুত্বারোপ | ক্যানসার গবেষণায় নতুন দিশা: টিউমারে রোগপ্রতিরোধী কোষের প্রবেশ বুঝতে এআই (AI) প্রযুক্তি তৈরি করলেন গবেষকেরা | দুর্গাপূজা: সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িকতার উৎসব | যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দুর্গোৎসবের মহাধুম | হিউস্টনের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন বিতর্ক: HISD-র রাজ্য-নিয়ন্ত্রিত পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন, বাড়ছে শিক্ষার্থী সংকট ও বাজেটের চাপ |
  • Home  
  • ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ ৭ বছর
- সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ ৭ বছর

ড. অমিত সরকার, হিউস্টন, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ সালটি যেমন ভারতের স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্তি নির্দেশ করে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতারও ২৫০ বছর পূর্তি। এই উপলক্ষে শুরুতেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীকে, যাঁদের আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা ও অবদানের ফলে আজ আমরা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করছি। কোনো দেশের স্বাধীনতা কখনোই সহজে অর্জিত হয় […]

ড. অমিত সরকার, হিউস্টন, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

২০২৬ সালটি যেমন ভারতের স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্তি নির্দেশ করে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতারও ২৫০ বছর পূর্তি। এই উপলক্ষে শুরুতেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীকে, যাঁদের আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা ও অবদানের ফলে আজ আমরা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করছি।

কোনো দেশের স্বাধীনতা কখনোই সহজে অর্জিত হয় না; এর পেছনে থাকে দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রাম। কোনো শাসকের করুণায় স্বাধীনতা অর্জিত হয় না। শেষ পর্যন্ত কোনো শাসক ক্ষমতা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় যখন সামরিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যেখানে ক্ষমতা ধরে রাখার চেয়ে সরে যাওয়াই তার জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাই সেই চিরন্তন প্রশ্নটি আবারও উত্থাপিত হতে পারে:

১৯৪৬ সালে ভাইসরয় ওয়াভেল, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি এবং রাজা ষষ্ঠ জর্জের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে ঠিক কী কারণে ভারত ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল?

এই প্রবন্ধে ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ স্বাধীনতার পূর্ববর্তী শেষ সাত বছরের ঘটনাবলি, কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তসমূহ নিয়ে প্রকাশিত তথ্য, বই এবং ইন্টারনেট-ভিত্তিক গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গি, বিশেষত সামরিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনা করা হয়েছে। এই চিরন্তন প্রশ্নটির বিষয়ে কিছুটা স্বচ্ছতা আনতে এখানে একটি স্বতন্ত্র বিশ্লেষণ ও মতামত উপস্থাপন করা হয়েছে।

শেষ সাত বছরের এই সময়সীমা বেছে নেওয়ার আরেকটি কারণ হলো; যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জনেও ৭ বছর সময় লেগেছিল: ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে ১৭৮৩ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর পর্যন্ত।

ভূমিকা

ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে মোটামুটি দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়:

  • ১৭৫৭–১৮৫৭: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন – ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ পর্যন্ত।
  • ১৮৫৭–১৯৪৭: ব্রিটিশ সরকারের সরাসরি শাসন।

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। বাংলায় সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬৩–১৮০০) ছিল তার অন্যতম প্রাথমিক উদাহরণ। এই বিদ্রোহের পেছনে ছিল অত্যাচারী করব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, এমন এক সময়ে যখন ভয়াবহ বাংলার দুর্ভিক্ষে আনুমানিক এক কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল।

১৮৫৭ পরবর্তী স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যাপক আকার নেওয়ার আগে বাংলায় তথা ভারতে শুরু হয় নবজাগরণ। রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২–১৮৩৩) ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০ – ১৮৯১) সামাজিক সংস্কার, আধুনিক শিক্ষা ও মুক্ত সংবাদপত্রের (১৮১৫-এর পর) বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮ – ১৮৯৪) তাঁর প্রথম উপন্যাস আনন্দমঠ (১৮৮২)-এ সন্ন্যাসী বিদ্রোহ এবং ১১৭৬ বঙ্গাব্দের দুর্ভিক্ষ  ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’এর কথা তুলে ধরেন। উপন্যাসটিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল “বন্দে মাতরম্” কবিতা/গানটি, যা এর আগেই ১৮৭৬ সালে রচিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে এটি ভারতের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী বিপ্লবীদের কাছে এক মহামন্ত্রে পরিণত হয়।

নবজাগরণের অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১), স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩–১৯০২), জে.সি. বোস (১৮৫৮–১৯৩৭), পি.সি. রায় (১৮৬১–১৯৪৪), সি.আর. দাস (১৮৭০–১৯২৫), এস.এন. বোস (১৮৯৪–১৯৭৪), মেঘনাদ সাহা (১৮৯৩–১৯৫৬), পি.সি. মহলানবিশ (১৮৯৩–১৯৭২) সমাজকে রূপান্তরিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা কঠোর ও পুরোনো প্রথার পরিবর্তে যুক্তিবাদ, উদার মানবতাবাদ এবং ভাষা, দর্শন, আইন, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটান।

এই নবজাগরণ আধুনিক যুগে ভারতীয়দের আত্মশাসনের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র/সামরিক সংগ্রাম এবং অহিংসা, অসহযোগ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ  উভয় ধারারই উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল।

প্রাথমিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল:

  • অনুশীলন সমিতি (১৯০২) প্রমথনাথ মিত্র ও সতীশচন্দ্র বসুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত।
  • যুগান্তর (১৯০৬) অরবিন্দ ঘোষ ও মানবেন্দ্রনাথ রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত।

সশস্ত্র সংগ্রামের উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ (১৮৭২–১৯৫০), বারীন্দ্রকুমার ঘোষ (১৮৮০–১৯৫৯), যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বা বাঘা যতীন (১৮৭৯–১৯১০), বিনায়ক দামোদর সাভারকর (১৮৮৩–১৯৬৬), রাসবিহারী বসু (১৮৮৬–১৯৪৫), ক্ষুদিরাম বসু (১৮৮৯–১৯০৮), সূর্য সেন (১৮৯৪–১৯৩৪), সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭–?), ভগৎ সিং (১৯০৭–১৯৩১) প্রমুখ।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (১৯১১–১৯৩২), যাঁকে “প্রথম নারী শহীদ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রামের একটি জাতিগতভাবে বিভাজিত ইউরোপীয় ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের নেতৃত্ব দেন। ক্লাবটির প্রবেশপথে লেখা ছিল   Dogs and Indians not allowed।

১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস অহিংস আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। এর উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে ছিলেন গোপালকৃষ্ণ গোখলে (১৮৬৬–১৯১৫), মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (১৮৬৯–১৯৪৮), জওহরলাল নেহরু (১৮৮৯–১৯৬৪) প্রমুখ।

অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৬ সালে, ১৮৮৮ সালে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের উত্থাপিত দ্বিজাতিতত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৮৭৬–১৯৪৮) সাত বছর কংগ্রেসে থাকার পর ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং মুসলিম অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তীকালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবির নেতৃত্ব দেন।

অরবিন্দ ঘোষের নেতৃত্বাধীন যুগান্তর গোষ্ঠীর ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী ১৯০৮ সালে মুজাফফরপুর বোমা হামলা চালান। তাঁদের লক্ষ্য ছিল কুখ্যাত জেলা জজ ডগলাস কিংসফোর্ডকে হত্যা করা।

১৯১৫ সালে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর গান্ধী চম্পারণ (বিহার, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ১৯১৭) এবং খেদা (গুজরাট, ১৯১৮)তে কৃষকদের ওপর অন্যায্য অতিরিক্ত কর এবং জোরপূর্বক নীলচাষের বিরুদ্ধে স্থানীয় সত্যাগ্রহ ও অহিংস আন্দোলন সংগঠিত করেন।

গান্ধীর প্রথম বৃহৎ সর্বভারতীয় অহিংস আন্দোলন ছিল রাওলাট সত্যাগ্রহ। এর পরিণতিতে ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, যেখানে এক হাজারেরও বেশি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারী নিহত হন।

১৯৪০ থেকে ১৯৪৭: প্রধান ঘটনাবলি

এই সময়টি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়। এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯–১৯৪৫), আজাদ হিন্দ ফৌজের সামরিক অভিযান, ব্রিটিশ-ভারতীয় সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহ এবং জাগ্রত জাতীয়তাবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারত স্বাধীন হয়। একই সঙ্গে মুসলিম লীগের দাবির ভিত্তিতে ধর্মভিত্তিক দেশভাগ সংঘটিত হয়।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সাত বছরের প্রধান ঘটনাবলি নিচে তুলে ধরা হলো।

১৯৪০

জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ লাহোর প্রস্তাব (২৩ মার্চ) গ্রহণ করে। এতে পৃথক সার্বভৌম মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হয়।

গান্ধী ও কংগ্রেস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের নিঃশর্ত অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেন। বিপরীতে জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ অংশগ্রহণকে সমর্থন করে, ভবিষ্যতে দেশভাগের বিষয়ে অনুকূল শর্ত পাওয়ার প্রত্যাশায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪–১৯১৮) অভিজ্ঞতা গান্ধীর অবস্থানকে প্রভাবিত করেছিল। সেই সময় কংগ্রেস ভারতীয় সৈন্যদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকে সমর্থন করেছিল এই প্রত্যাশায় যে যুদ্ধ শেষে ভারত স্বশাসন লাভ করবে। কিন্তু যুদ্ধ জয়ের পর ব্রিটিশরা স্বাধীনতার পরিবর্তে দিল্লির ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে দমনমূলক রাওলাট আইন পাস করে। এর বিরুদ্ধে গান্ধীর আন্দোলন ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে গিয়ে শেষ হয়।

সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সভাপতি পদে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর গান্ধীর সঙ্গে মতাদর্শগত বিরোধের কারণে পদত্যাগ করেন এবং ফরোয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪০ সালের জুনে নাগপুরে তিনি দলের প্রথম সর্বভারতীয় সম্মেলন করেন।

বসু ব্রিটেনের যুদ্ধকালীন দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অবিলম্বে একটি তীব্র জাতীয় সংগ্রাম শুরু করার পক্ষে প্রচার করেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার জুলাই মাসে তাঁকে গ্রেপ্তার করে গৃহবন্দি করে।

ব্রিটিশ রাজ ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের মতামত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে ঘোষণা করে যে ভারত জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করেছে। ব্রিটিশরা ২৫ লক্ষেরও বেশি ভারতীয় সৈন্য নিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন করে যা ইতিহাসের বৃহত্তম স্বেচ্ছাসেবী সেনাবাহিনী হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং তারা বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করে।

গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। স্বাধীনতার দাবি তা অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে হোক বা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ব্রিটিশ পুলিশের গ্রেপ্তার ও বিচারব্যবস্থার দমননীতির মুখে পড়ে। ব্রিটিশ রাজের চূড়ান্ত শক্তি ছিল ব্রিটিশ-ভারতীয় সামরিক বাহিনী।

১৯৪১

১৬ জানুয়ারি সুভাষচন্দ্র বসু কলকাতায় গৃহবন্দিত্ব থেকে পালিয়ে আফগানিস্তান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে জার্মানির বার্লিনে পৌঁছান। ২ এপ্রিল তিনি বার্লিনে পৌঁছে ব্রিটিশবিরোধী জোট গঠনের চেষ্টা করেন।

সেখানে তিনি জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতীয় স্বাধীনতার একটি খসড়া ঘোষণা জমা দেন। তিনি প্রবাসী সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

বসু FREE INDIA CENTRE (Zentrale Freies Indien) প্রতিষ্ঠা করেন, যা তাঁর প্রস্তাবিত অস্থায়ী সরকারের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মিশন হিসেবে কাজ করে।

২২ জুন জার্মানি আকস্মিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ করে। এর ফলে ১৯৩৯ সালের আগস্ট থেকে গড়ে ওঠা জার্মানি-সোভিয়েত সহযোগিতার অবসান ঘটে। ১২ জুলাই সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্রিটেনের সঙ্গে Anglo-Soviet Agreement স্বাক্ষর করে এবং মিত্রশক্তির অংশীদার হয়।

১৯৪২

বার্লিনে বসু উত্তর আফ্রিকায় বন্দি ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে ইন্ডিয়ান লিজিয়ন গঠন শুরু করেন। ভারতীয় স্বেচ্ছাসেবক ও জার্মান কর্মকর্তাদের মধ্যে “নেতাজি” উপাধিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারিতে তিনি বার্লিনে আজাদ হিন্দ রেডিও প্রতিষ্ঠা করেন এবং ব্রিটিশবিরোধী বার্তা প্রচার শুরু করেন।

ব্রিটিশ সরকার স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের নেতৃত্বে একটি মিশন ভারতে পাঠায়। এতে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারতকে ডোমিনিয়ন মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু গান্ধী ও কংগ্রেস প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে, কারণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের হাতে থাকার কথা ছিল। মুসলিম লীগও প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে, কারণ এতে পাকিস্তান সৃষ্টির নিশ্চয়তা ছিল না।

২৯ মে বসুর সঙ্গে অ্যাডলফ হিটলারের সরাসরি সাক্ষাৎ হয়। হিটলার ভারতীয় স্বাধীনতার বিষয়ে প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে অনিচ্ছুক থাকেন। ফলে বসু জাপানের দিকে সামরিক সহযোগিতার জন্য তাকান। জার্মান সাবমেরিনের মাধ্যমে জাপানে পৌঁছানোর জন্য হিটলার যাত্রাপথে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের পরিকল্পনার পর আগস্টে গান্ধী ভারত ছাড়ো আন্দোলন (Quit India Movement) শুরু করেন। ব্রিটিশ সরকার দ্রুত গান্ধী, নেহরুসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের কারারুদ্ধ করে।জয়প্রকাশ নারায়ণ, অরুণা (গাঙ্গুলী) এবং আসফ আলীর মতো কংগ্রেস ও সমাজতান্ত্রিক নেতারা আত্মগোপনে যান। ছাত্র, শ্রমজীবী মানুষ ও তরুণরা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। সরকারি স্থাপনায় হামলা ও ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।

গান্ধী “করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে”  “করব, নয়তো মরব” এই আহ্বান জানান।

সাতারা, মেদিনীপুর, বল্লিয়া ও সুরাটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আন্দোলনের প্রভাব পড়ে। এক লক্ষেরও বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয় এবং পুলিশের গুলিতে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হন। মেদিনীপুরে আন্দোলন অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করা হয়। ২৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ সত্যাগ্রহীদের মিছিলে গুলি চালালে মাতঙ্গিনী হাজরা (১৮৭০–১৯৪২) নিহত হন।

বসু গান্ধীর আন্দোলনকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করেন এবং বার্লিন থেকে বিদ্রোহীদের উদ্দেশে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বিস্তারিত নির্দেশনা প্রচার করেন। তিনি দূরপ্রাচ্যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতাদের ব্যাংকক সম্মেলনেও বার্তা পাঠান, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে ওঠে।মুসলিম লীগ ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে দূরে থাকে। ১৯৪৩ সালের মার্চ নাগাদ ভারত ছাড়ো আন্দোলন কার্যত স্তিমিত হয়ে যায়।

১৯৪৩

২৬ জানুয়ারি বসু বার্লিনে ভারতের স্বাধীনতা দিবস  ১৯৩০ সালের কংগ্রেস ঘোষিত পূর্ণ স্বরাজ দিবস উপলক্ষে একটি উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

৮ ফেব্রুয়ারি তিনি জার্মান বন্দর কিল থেকে জার্মান U-180 সাবমেরিনে করে জাপানের উদ্দেশে বিপজ্জনক যাত্রা শুরু করেন।

২৮ এপ্রিল মাদাগাস্কারের উপকূলের কাছে ভারত মহাসাগরে এক ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্র অভিযানে তিনি জার্মান সাবমেরিন থেকে জাপানি I-29 সাবমেরিনে স্থানান্তরিত হন।

৬ মে জাপানি সাবমেরিনটি সুমাত্রার কাছে সাবাং দ্বীপে পৌঁছায়। কয়েক দিন বিশ্রামের পর ১১ মে বসু জাপানি বিমানে টোকিও পৌঁছান এবং “মাতসুদা” ছদ্মনামে ইম্পেরিয়াল হোটেলে ওঠেন।

এদিকে জাপানে রাসবিহারী বসু ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গদর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবী ছিলেন এবং ১৯১৫ সালে ভারত থেকে জাপানে পালিয়ে যান।

গদর আন্দোলন

গদর আন্দোলন ছিল বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের  বিশেষত উত্তর আমেরিকার পাঞ্জাবি শ্রমিকদের  দ্বারা পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক বিপ্লবী অভিযান। এর উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্রভাবে ব্রিটিশ রাজকে উৎখাত করা।

১৯১৩ সালে সোহন সিং ভকনা ও লালা হরদয়ালের মতো নেতাদের উদ্যোগে গদর পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা পাঞ্জাবি ও উর্দু ভাষায় Ghadar পত্রিকা প্রকাশ করত, যার শিরোনামে ছিল “ব্রিটিশ শাসনের শত্রু” (Angrezi Raj Ka Dushman)।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার জন্য হাজার হাজার গদরপন্থী ভারতীয় দেশে ফিরে আসে। তারা অস্ত্র পাচার এবং জার্মানি ও জাপানের কাছ থেকে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ ঘটানোর পরিকল্পনা করে।

১৯১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির জন্য পরিকল্পিত সাধারণ বিদ্রোহ অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ব্যর্থ হয়। ব্রিটিশরা পাঞ্জাবের বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন করে এবং লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হয়।গদর আন্দোলনের আদর্শ পরবর্তীকালে ভগৎ সিংসহ বহু বিপ্লবীকে প্রভাবিত করে।এক অর্থে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাসবিহারী বসু ও তাঁর সহযোগীরা যে কাজের চেষ্টা করেছিলেন, তার প্রায় ২৭ বছর পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সুভাষচন্দ্র বসু তারই একটি বৃহত্তর রূপ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন।

১০ জুন বসু জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তোজোর সঙ্গে প্রথম ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতীয় স্বাধীনতার জন্য নিঃশর্ত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি পান বলে উল্লেখ করা হয়।

১৪ জুন দ্বিতীয় বৈঠকে জাপানি নিয়ন্ত্রণ থেকে ভারতীয় বাহিনীর স্বাধীনতার বিষয়ে পারস্পরিক শর্ত চূড়ান্ত হয়।

১৬ জুন বসু জাপানের ইম্পেরিয়াল ডায়েটের বিশেষ অধিবেশনে উপস্থিত হন।

১৯ জুন টোকিওতে এক আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করেন যে ব্রিটিশদের স্থায়ীভাবে ভারত ছেড়ে যেতে হবে।

৪ জুলাই ১৯৪৩ সিঙ্গাপুরে বসু পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (INA) বা আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব রাসবিহারী বসুর কাছ থেকে গ্রহণ করেন।

২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরের ক্যাথে থিয়েটারে তিনি স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার (Arzi Hukumat-e-Azad Hind) ঘোষণা করেন।

বসু একই সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী ও যুদ্ধমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আজাদ হিন্দ সরকার ন্যাশনাল ব্যাংক অব আজাদ হিন্দ প্রতিষ্ঠা করে, নিজস্ব মুদ্রা চালু করে এবং “জয় হিন্দ” অভিবাদন ব্যবহার করে।

বসু আজাদ হিন্দ ফৌজকে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেন।স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার নয়টি দেশের কূটনৈতিক স্বীকৃতি পায়, যার মধ্যে জাপান, জার্মানি ও ইতালি ছিল।নভেম্বরে বৃহত্তর পূর্ব এশিয়া সম্মেলনে অংশ নিতে বসু টোকিও যান। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তোজো ঘোষণা করেন যে ১৯৪২ সালে জাপানের দখলে আসা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে হস্তান্তর করা হবে।

৩০ ডিসেম্বর নেতাজি আন্দামান দ্বীপে গিয়ে পোর্ট ব্লেয়ারের জিমখানা গ্রাউন্ডে ভারতীয় জাতীয় পতাকা তোলেন। তিনি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে আজাদ হিন্দ সরকারের মুক্ত ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করেন। প্রতীকীভাবে আন্দামানকে শহীদ দ্বীপ এবং নিকোবরকে স্বরাজ দ্বীপ নাম দেন।

১৯৪৩–১৯৪৪ সালের বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষ

১৯৪৩ –১৯৪৪ সালের বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষে বাংলা ও আশপাশের অঞ্চলে আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষ মারা যায়। এই সময় ব্রিটিশ রাজ বিদেশে খাদ্য রপ্তানি অব্যাহত রাখে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ভারতীয় জনগণের দুর্ভোগকে অবহেলা করেন এবং সংকটের জন্য স্থানীয় অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে দায়ী করেন। তাঁর বক্তব্যে ভারতীয়দের সম্পর্কে অত্যন্ত অবমাননাকর মন্তব্যও পাওয়া যায়।

১৯৪৪

জানুয়ারিতে নেতাজি আজাদ হিন্দ সরকারের সদর দপ্তর ও INA-এর কেন্দ্র সিঙ্গাপুর থেকে বার্মার রেঙ্গুনে (ইয়াঙ্গুন) স্থানান্তর করেন, যাতে ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি থেকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা যায়।

INA-এর সুভাষ ব্রিগেড এবং জাপানি বাহিনী “U-Go” অভিযান শুরু করে। তারা বার্মা সীমান্ত অতিক্রম করে আসাম ও মণিপুরে ব্রিটিশ অবস্থানের ওপর সরাসরি আক্রমণ চালায়।মার্চে INA সৈন্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। ১৪ এপ্রিল ১৯৪৪ মণিপুরের মইরাং-এ INA-এর কর্নেল শওকত আলী মালিক মুক্ত ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রথমবারের মতো ভারতীয় তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করেন। দিনটি প্রতিবছর INA Flag Hoisting Day হিসেবে স্মরণ করা হয়।

নেতাজি আজাদ হিন্দ রেডিও থেকে গান্ধীকে প্রথমবারের মতো “জাতির পিতা” বলে সম্বোধন করে ভারতের স্বাধীনতার “পবিত্র যুদ্ধ” এ তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। কোহিমা ও ইম্ফলের যুদ্ধে তীব্র লড়াই হয়।

এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে প্রবল বর্ষা, জাপানি সরবরাহব্যবস্থার ভেঙে পড়া এবং মিত্রবাহিনীর পাল্টা আক্রমণে অভিযান থেমে যায়। অভিযান ব্যর্থ হয় এবং INA-র বিপুলসংখ্যক সৈন্য অনাহার, রোগ ও যুদ্ধে প্রাণ হারায়। আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের বার্মার দিকে পশ্চাদপসরণ করতে হয়।জুনে শারীরিক অসুস্থতার কারণে গান্ধী কারাগার থেকে মুক্তি পান।গান্ধী ও জিন্নাহ সরাসরি আলোচনা করলেও ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে মতবিরোধের কারণে কোনো সমাধান হয়নি।

১৯৪৫

জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে অগ্রসরমান ব্রিটিশ চতুর্দশ বাহিনীর চাপে নেতাজি রেঙ্গুন থেকে INA ও আজাদ হিন্দ সরকারের অবকাঠামো সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।মিত্রবাহিনী বার্মার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল পুনর্দখল করলে INA ব্যাংককের দিকে পশ্চাদপসরণ করে।

৭/৮ মে জার্মানি মিত্রবাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে।দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অক্ষশক্তির সামরিক অবস্থান ভেঙে পড়ে। INA জুন মাসে অবিলম্বে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করে এবং বিকল্প কূটনৈতিক পথ খোঁজার চেষ্টা করে।

২৬ জুলাই ১৯৪৫ লেবার পার্টির বিপুল নির্বাচনী জয়ের পর ক্লেমেন্ট অ্যাটলি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হন এবং উইনস্টন চার্চিলের স্থলাভিষিক্ত হন।

১৫ আগস্ট জাপান মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয়। এর ফলে INA-এর সক্রিয় সামরিক পর্ব কার্যত শেষ হয়ে যায়। ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে ব্যাপক বিদ্রোহ ঘটানোর যে আশা ছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি।

১৫ আগস্ট সিঙ্গাপুর থেকে নেতাজি তাঁর সৈন্য ও সমর্থকদের উদ্দেশে শেষ রেডিও ভাষণ দেন।

১৮ আগস্ট ১৯৪৫ নেতাজি দ্বিতীয়বারের মতো পালিয়ে যান বলে Justice Mukherjee Commission of Inquiry and Report (2005)-এ উল্লেখ করা হয়। তবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কংগ্রেস সরকার এই কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি।

INA-এর যুদ্ধবন্দীদের দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়। ব্রিটিশ রাজ তখনও ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখার উদ্দেশ্যে কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। ১৮৫৭–৫৮ সালের সিপাহী বিদ্রোহ-পরবর্তী বিচারের মতোই তারা ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্যদের জন্য একটি কঠোর বার্তা দিতে চেয়েছিল।এই উদ্দেশ্যে দিল্লির লালকেল্লায় তিনটি প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী তিনজন INA অফিসারের প্রকাশ্য বিচার শুরু করা হয়:

  1. শাহনওয়াজ খান –  মুসলিম
  2. প্রেম সেহগাল – হিন্দু
  3. গুরবক্ষ সিং ধিল্লন – শিখ

৫ নভেম্বর বিচার শুরু হয়।তাঁদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা, হত্যা এবং হত্যায় সহায়তার অভিযোগ আনা হয়।প্রখ্যাত আইনজীবী ভূলাভাই দেশাই প্রতিরক্ষার প্রধান আইনজীবী হিসেবে ঐতিহাসিক যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি যুক্তি দেন যে একটি পরাধীন জাতির স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করার আইনগত অধিকার রয়েছে।প্রতিরক্ষা পক্ষের বক্তব্য ছিল INA একটি অস্থায়ী সরকারের সংগঠিত সেনাবাহিনী; সুতরাং এর সদস্যরা বৈধ যুদ্ধবন্দী, রাষ্ট্রদ্রোহী নয়। তাঁদের দাবি ছিল, একটি বিদেশি সার্বভৌম অস্থায়ী সরকারের অধীনে যুদ্ধরত সৈন্যদের ওপর ব্রিটিশ অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রদ্রোহ আইন প্রযোজ্য নয়।

INA বিচার এবং জনমত

INA-এর বিচার ব্রিটিশদের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনে।ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যুদ্ধবন্দীদের অস্থায়ী ঘেরাটোপে রাখে, যেগুলোকে প্রায়ই POW cages বলা হতো। দিল্লির আশপাশে দৃশ্যমান এসব ঘেরাটোপ জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে এবং সারা ভারতে জাতীয়তাবাদী প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধকালীন সংবাদ-নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার ফলে ভারতীয় সংবাদপত্রগুলো প্রতিদিন বিচার ও প্রতিরক্ষা পক্ষের তীব্র ঔপনিবেশিক-বিরোধী যুক্তি প্রকাশ করতে থাকে। আদালত পরিণত হয় এক বিশাল জাতীয়তাবাদী মঞ্চে।৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৫ আদালত প্রথম তিন অফিসারকে “King-Emperor-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ” করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে।

১৯৪৬

সারা ভারতে, বিশেষত কলকাতা, দিল্লি ও বোম্বেতে জনবিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। বিচারাধীন সৈন্যরা জাতীয় বীরের মর্যাদা পায় এবং ব্যাপক জনসভা, ছাত্র ধর্মঘট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়।তৎকালীন তরুণ ছাত্র সলিল চৌধুরী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন এবং তাঁর প্রথম কবিতা/গান রচনা করেন:

“বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা।”

এই গান/কবিতায় তিনি জনসমক্ষে চলা বিচারকে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত প্রহসন হিসেবে সমালোচনা করেন।

ব্রিটিশরা দ্রুত উপলব্ধি করে যে INA বিচার তাদের সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি দেশীয় ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আনুগত্য দুর্বল করে দিয়েছে।গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতীয় সৈন্য ও প্রাক্তন সৈন্যদের মধ্যে INA যুদ্ধবন্দীদের প্রতি ব্যাপক সহানুভূতি রয়েছে।দেশব্যাপী বিদ্রোহের আশঙ্কায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর Commander-in-Chief ক্লদ অচিনলেক ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা ও অসন্তোষের মুখে INA অফিসারদের সাজা কমিয়ে দিতে বাধ্য হন। পরবর্তী বিচারগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ

ব্রিটিশদের আশঙ্কা অনুযায়ী, জনতার ক্ষোভ যুদ্ধ-অভিজ্ঞ ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় বাহিনীতে তখন দশ লক্ষেরও বেশি সৈন্য ছিল।অন্যদিকে ভারতে ব্রিটিশ সৈন্যের সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম প্রায় পাঁচটি শ্বেতাঙ্গ ডিভিশনে মোটামুটি এক লক্ষের মতো। যুদ্ধশেষে তারাও ক্লান্ত ও দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী ছিল।

ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন।ফেব্রুয়ারির শুরুতে ব্রিটিশ-ভারতীয় বিমানবাহিনী ভারত, সিলন ও বার্মার প্রায় ৬০টি RAF ও আঞ্চলিক বিমানঘাঁটিতে ছড়িয়ে থাকা বিমানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করতে অস্বীকার করে।এরপর শুরু হয় Royal Indian Navy (RIN) Mutiny।বোম্বের HMIS Talwar নৌঘাঁটির নাবিকরা “No Food, No Work” ধর্মঘটে যায়। বর্ণবৈষম্য এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ দ্রুত বহু জাহাজ ও উপকূলীয় ঘাঁটিতে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৪৬ সালের নৌবিদ্রোহের সময়রেখা

  • ১৭ ফেব্রুয়ারি: বোম্বের Castle Barracks ও HMIS Talwar-এর নাবিকরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কঠোর আচরণের প্রতিবাদে অনশন শুরু করেন।
  • ১৮ ফেব্রুয়ারি: HMIS Talwar-এর নাবিকরা নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলে আনুষ্ঠানিক বিদ্রোহ শুরু হয় এবং তা দ্রুত অন্যান্য ইউনিটে ছড়িয়ে পড়ে।
  • ১৯ ফেব্রুয়ারি: বিদ্রোহ সর্বভারতীয় রূপ নেয়। বোম্বে, করাচি, মাদ্রাজ ও বিশাখাপত্তনমে প্রায় ৬০–৭৮টি জাহাজে প্রায় ২০,০০০ নাবিক ধর্মঘটে যোগ দেন।একই সময়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলি Cabinet Mission উদ্যোগ ঘোষণা করেন।
  • ২০–২২ ফেব্রুয়ারি: ব্যাপক সাধারণ ধর্মঘটে বোম্বে কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ বাহিনী ও জনতার মধ্যে সংঘর্ষ হয়। রয়্যাল নেভির যুদ্ধজাহাজ ও RAF বিমান অবস্থান নেয়। করাচিতে HMIS Hindustan-এর নাবিকদের সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়।
  • ২২ ফেব্রুয়ারি: প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নৌবিদ্রোহের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন।
  • ২৩ ফেব্রুয়ারি: কংগ্রেসের সরদার প্যাটেল ও মুসলিম লীগের জিন্নাহসহ রাজনৈতিক নেতাদের জরুরি আবেদন ও হস্তক্ষেপের পর কেন্দ্রীয় স্ট্রাইক কমিটি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে।

এই বিদ্রোহের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন এর অন্যতম অংশগ্রহণকারী বলাইচন্দ্র দত্ত, যিনি HMIS Talwar-এর নাবিক ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ Mutiny of the Innocents-এ তিনি এই ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন।লেখক প্রমোদ কাপুর এই ঘটনাকে “Last War of Independence” বলে অভিহিত করেছেন।এর পাশাপাশি ২৭ ফেব্রুয়ারি জবলপুরে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনী/ইন্ডিয়ান সিগন্যাল কর্পসের ১,৭০০-এরও বেশি সদস্যের প্রতিবাদ সংঘটিত হয়।

গান্ধীর অবস্থান

গান্ধী নৌবিদ্রোহের বিরোধিতা করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ পুণেতে দেওয়া তাঁর প্রেস বিবৃতিতে তিনি বলেন: “এই নৌবিদ্রোহ এবং তার পরবর্তী ঘটনাগুলো কোনো অর্থেই অহিংস কর্ম নয়।”

তিনি ট্রাম পোড়ানো, সম্পত্তি ধ্বংস এবং ইউরোপীয়দের অপমান বা আহত করাকে কংগ্রেসের, এবং বিশেষত তাঁর নিজের, অহিংস নীতির সঙ্গে অসঙ্গত বলে উল্লেখ করেন।অন্যদিকে অরুণা আসফ আলীসহ কংগ্রেস, সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট নেতাদের অনেকে নৌবিদ্রোহকে সমর্থন করেন।

অরুণা আসফ আলীর অবস্থানের প্রসঙ্গে গান্ধী বলেন: “আমি শ্রীমতী অরুণা আসফ আলীর সাহসীভাবে আমার বক্তব্যের বিরোধিতা করাকে অভিনন্দন জানাই।” অরুণা আসফ আলীর বক্তব্য ছিল—জনগণ সহিংসতা বা অহিংসার নীতিশাস্ত্র নিয়ে আগ্রহী নয়; তারা জানতে চায় কোন পথ জনগণের স্বাধীনতা এনে দেবে।

ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সম্ভবত ১৮৫৭ সালের মতো আরেকটি সিপাহী বিদ্রোহের আশঙ্কা করেছিল। ভাইসরয় ওয়াভেল ভারতে অবস্থানরত প্রায় ৯০,০০০ ইউরোপীয় নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিলেন।

ক্যাবিনেট মিশন

১৯ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করা Cabinet Mission-এ ছিলেন:

  • লর্ড পেথিক-লরেন্স
  • স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস
  • এ.ভি. আলেকজান্ডার

মিশনটি ২৪ মার্চ ১৯৪৬ ভারতে আসে। এর লক্ষ্য ছিল শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ খুঁজে বের করা। এটি ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্যায়ের সূচনা।

১৯৪৭

২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তিনি জানান, সর্বোচ্চ জুন ১৯৪৮-এর মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।পরবর্তীতে রাজা ষষ্ঠ জর্জ ১৮ জুলাই ১৯৪৭ Indian Independence Act 1947-এ রাজকীয় অনুমোদন দেন। এর মাধ্যমে ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ ক্ষমতা হস্তান্তরের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারিত হয়।

উপসংহার

সামরিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে ভারত থেকে সংগৃহীত করের অর্থ দিয়ে ভারতীয় পণ্য কেনা হতো এবং অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই তা ব্রিটেনে পাঠানো হতো। ভারত আবার ব্রিটেনে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ সস্তা শিল্পপণ্য কিনত।

ব্রিটেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিশাল শক্তিকে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যবহার করত, যার ব্যয় ব্রিটিশ করদাতাদের ওপর সরাসরি পড়ত না।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ঋণ GDP-এর প্রায় ২৫০ শতাংশে পৌঁছায় এবং ১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ পাউন্ড তার রিজার্ভ কারেন্সির মর্যাদা মার্কিন ডলারের কাছে হারায়।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারতে বৃহৎ সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের তুলনায় পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে ভারতের উপনিবেশ হিসেবে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক লাভজনকতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। মণিপুরের মইরাং INA মিউজিয়ামের দেয়ালে INA-এর অবদান সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তাশীল মূল্যায়ন পাওয়া যায়: “সামরিক পরাজয় সত্ত্বেও, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে INA-এর অবদান ছিল অপরিসীম। ১৯৪৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪৬ সালের মে পর্যন্ত দিল্লিতে প্রাক্তন INA সদস্যদের লালকেল্লা বিচার সারা ভারতে সহানুভূতি ও দেশপ্রেমের এক বিশাল ঢেউ সৃষ্টি করে এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষকে একত্রিত করে। INA-এর প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন এবং ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, তা ভারতে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব দুর্বল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে INA তাই কেবল একটি সামরিক সংগঠন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি  এটি সাহস, ঐক্য ও আত্মত্যাগের প্রতীকে পরিণত হয়। যদিও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ভারতকে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্ত করার লক্ষ্য অর্জিত হয়নি, INA জাতীয়তাবাদের এক নতুন চেতনা জাগিয়ে তোলে, যা ব্রিটিশ শাসনের অবসানকে ত্বরান্বিত করে।” INA-এর বিচার ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনে।

যদিও ব্রিটিশরা ১৯৪৬ সালের নৌবিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়েছিল, এই ঘটনাগুলো ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের মধ্যে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর আনুগত্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এই ঘটনাগুলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা উপলব্ধি করতে শুরু করে যে তারা আর সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর আনুগত্যের ওপর নির্ভর করতে পারবে না।

স্বাধীনতা সংগ্রামের আগের পর্যায়গুলোর সশস্ত্র বা অহিংস প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো ব্রিটিশরা মোকাবিলা করতে পেরেছিল, কারণ ব্রিটিশ-ভারতীয় সামরিক বাহিনী তখন তাদের প্রতি অনুগত ছিল।দুর্ভাগ্যবশত, স্বাধীনতা সংগ্রামের এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

স্বাধীনতার সময়কার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলি পরবর্তীকালে স্বীকার করেছিলেন বলে প্রচলিত আছে যে INA বিচার ভারতীয় সামরিক বাহিনীর আনুগত্যে যে গভীর আঘাত করেছিল, তা ব্রিটিশদের দ্রুত ভারত ত্যাগের পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।

১৯৫৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত গভর্নর ও কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বিচারপতি পি.বি. চক্রবর্তী প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে কিছু অপ্রমাণিত সংবাদসূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

অতএব, এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারত ছেড়ে যাওয়ার জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রেরণা সম্ভবত তৈরি হয়েছিল:

  1. INA-এর যুদ্ধবন্দীদের বিচারকে কেন্দ্র করে ভারতীয় জনমতের ব্যাপক জাগরণ;
  2. ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ এবং অন্যান্য সামরিক অসন্তোষ;
  3. ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্যদের আনুগত্য ভবিষ্যতে কতটা নিশ্চিত থাকবে—এই প্রশ্নের উদ্ভব;
  4. এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটেনের গুরুতর অর্থনৈতিক ও সামরিক দুর্বলতা।

অর্থাৎ, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্যায়কে শুধু অহিংস আন্দোলন বা শুধু সশস্ত্র সংগ্রামের কোনো একক ধারায় ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। রাজনৈতিক আন্দোলন, বিপ্লবী ও সশস্ত্র সংগ্রাম, INA-এর কর্মকাণ্ড, INA বিচার, ১৯৪৬ সালের সামরিক বিদ্রোহ, জনতার জাগরণ এবং যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনের সামরিক-অর্থনৈতিক দুর্বলতা  সবগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করলেই ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ প্রস্থানের প্রেক্ষাপটটি আরও পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা সম্ভব।

তথ্যসূত্র

  • Mutiny of the Innocents, B. C. Dutt, 1971; Revised Edition, 2015.
  • 1946: Last War of Independence, Royal Indian Navy Mutiny, Pramod Kapoor, 2022.
  • Report of the Justice Mukherjee Commission of Inquiry on the alleged disappearance of Netaji Subhas Chandra Bose, Volume II B, 2005.
  • Gandhi: Press Statements 1946 – https://www.mkgandhi.org/mynonviolence/chap82.php

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সুরাঙ্গন নিউজ - আমাদের কথা

২০১৭ সাল থেকে সুরাঙ্গন নিউজ বৃহত্তর হিউস্টন এলাকার বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংবাদ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও কমিউনিটির খবর তুলে ধরছে।

প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যের সংযোগ এবং বাঙালি কমিউনিটির সাফল্য ও কর্মকাণ্ড তুলে ধরাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

সুরাঙ্গন নিউজ শুধু একটি সংবাদপত্র নয় – এটি প্রবাসী বাঙালির কণ্ঠস্বর ও আমাদের সংস্কৃতির একটি সেতুবন্ধন। 

Subscribe:
Surangan News

সম্পাদক

Dr. Pradip Ghosh

Published by: Surangan Foundation, Houston, Texas

সম্পাদকীয় পরিষদ:

Khaled Zulfiqar Khan, Dr. Swapan Dasgupta, Zulfiqar Karni, Mustafa R Rahman, Sheikh Ahad, Dr. Nadeem Ashraf

Health & Science: Pritha Ghosh

যোগাযোগ

Head Office: 17714 Strolling Stream Ln, Richmond, Texas 77407
Phone: 832-274-6823
Email: info@surangannews.com
Website: www.surangannews.com

Grow your Business with Surangan News 

Each issue is distributed in 5,000 print copies and reaches an additional 10,000 email subscribers

© 2026 Surangan News – Houston | Developed By Modern Web Solution