আগামী বছর ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্ক ও হিউস্টনে পৃথক সম্মেলনের প্রস্তুতি !
সুরাঙ্গন নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক: ঐক্যের প্রত্যাশা থাকলেও বিভক্তির বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না উত্তর আমেরিকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্ল্যাটফর্ম ফোবানা (Federation of Bangladeshi Associations in North America)। চলতি বছরের লেবার ডে উইকেন্ডে নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়া ও কানাডার টরন্টোতে পৃথকভাবে চারটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী বছরও ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্ক ও হিউস্টনে পৃথক সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। এর সঙ্গে নিউইয়র্কের বাফেলোতেও একটি আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রায় চার দশকের পুরোনো এই সংগঠনের বিভক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঐক্যের আলোচনা চললেও সাংগঠনিক বাস্তবতায় তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। একই সময়ে একই নামে একাধিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যেমন বিস্ময় তৈরি হয়েছে, তেমনি হতাশা ও ক্ষোভও রয়েছে। অনেকের প্রশ্ন—চারটি আয়োজনের মধ্যে কোনটি মূল ফোবানা?
চার শহরে চার আয়োজন
লেবার ডে উইকেন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার চার শহরে ফোবানার ৩৯ বছর পূর্তি ও চার দশকে পদার্পণ উপলক্ষে পৃথক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

নিউইয়র্কের এস্টোরিয়ায় ইভাঞ্জেলিক্যাল ক্রিশ্চিয়ান চার্চ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনটি ‘এনআরবি অ্যাসোসিয়েশন’-এর উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। ‘চেতনায় ৭১, হৃদয়ে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধ, অভিবাসন, নারী ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। জাকারিয়া চৌধুরী, দেওয়ান মনিরুজ্জামান, নূরুল আমিন বাবু ও মঞ্জুর কাদেরের নেতৃত্বে আয়োজিত সম্মেলনটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনিভার্সাল সিটিতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয় ফিতা কেটে ও বেলুন উড়িয়ে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ কনসাল জেনারেল কাজী মোহাম্মদ জাবেদ ইকবাল এবং কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি পৌঁছে দিতে ফোবানার মতো আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একটি ঐক্যবদ্ধ ফোবানা সম্মেলনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

ফ্লোরিডার কিসিমিতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার উদ্যোগে আরেকটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সামাজিক ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনার পাশাপাশি সংগীত ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের তারকাদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সাংস্কৃতিক পর্বে ব্যাপক দর্শক উপস্থিতি থাকলেও সেমিনার ও আলোচনা পর্বে উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল।

কানাডার টরন্টোর ডন ভ্যালি হোটেল অ্যান্ড সুইটসে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ সম্মেলন। গিয়াস আহমেদ, শাহ নেওয়াজ, আবু যুবায়ের দারা ও ফিরোজ আহমেদের নেতৃত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রবাসীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, অভিনেত্রী ববিতাসহ বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও বিনোদন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মাননা দেওয়া হয়। কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার নাহিদা সোবহানও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
তিন দিনের এই আয়োজনে বাংলাদেশ ও টরন্টোর স্থানীয় শিল্পীদের সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মেলার আয়োজন ছিল। দ্বিতীয় দিনে টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাও উপস্থিত ছিলেন।
বিভক্তি নিয়ে প্রশ্ন
ফোবানার বিভক্তি নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। কারও মতে, সংগঠনটি ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐক্যের প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি নেতৃত্ব, সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাব প্রদর্শনের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কোন আয়োজন বড়, কোথায় বেশি দর্শক, কার অনুষ্ঠানে বেশি তারকা বা কে বেশি স্পনসর পেয়েছেন—এ ধরনের প্রতিযোগিতা বিভক্তিকে আরও গভীর করছে বলে তাদের অভিযোগ।
কিছু প্রবাসী আবার ফোবানা সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ থেকে শিল্পী ও অতিথিদের আমন্ত্রণ, ভিসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগের বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন। কেউ কেউ একে ‘দাওয়াত বাণিজ্য’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের বক্তব্য ও নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করেন, নেতৃত্বের কোন্দল ও সাংগঠনিক বিভাজনের কারণে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির বিপুল মেধা, অর্থ ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণেই ফোবানার বিভক্তি অনেকের কাছে আরও হতাশাজনক।
৪০তম বছরে সংগঠনটির সামনে তাই বড় প্রশ্ন—কোন শহরের সম্মেলনে বেশি দর্শক হলো বা কে বেশি তারকা আনল, তা নয়; বরং যে সংগঠনের জন্ম হয়েছিল উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের এক ছাতার নিচে আনার লক্ষ্যে, নেতৃত্বের বিভাজন ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ফোবানা কি আবার একটি সত্যিকারের ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারবে?
প্রসঙ্গত, ১৯৮৭ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রথম সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ফোবানার যাত্রা শুরু হয়। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি, বাংলাদেশি ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রচার-প্রসার এবং বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরি করাও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে এতবিভক্তি ও বিতর্কের মধ্যেও লেবার ডে উইকেন্ডের চারটি আয়োজনই হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির জন্য আনন্দ ও মিলনমেলার উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। দেশীয় গান, নৃত্য, খাবার, শাড়ি-পাঞ্জাবি এবং পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলনের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।


