শরীরে কিছু নির্দিষ্ট পুষ্টির অভাব থাকলেও অল্পেই মাথা গরম, অতিরিক্ত বিরক্তি, রাগ, খিটখিটে মেজাজ বা চিৎকার-চেঁচামেচির মতো আচরণ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সিভিয়ার ইরিটেবিলিটি (Severe Irritability)।
অপছন্দের কোনো কথা শুনে আপনি চাইলে এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু এড়িয়ে গেলেন না। প্রচণ্ড বিরক্ত হলেন, মাথা গরম হয়ে গেল, এবং সেই অনুভূতি আচরণেও প্রকাশ পেল- চিৎকার পর্যন্ত করে ফেললেন, যা আপনার স্বাভাবিক স্বভাবের সঙ্গে মেলে না।
এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্যশীল কেউ ভাবতে পারেন, আপনি হয়তো মানসিকভাবে চাপে আছেন বা বিপর্যস্ত। অনেকেই দায়ী করেন মানসিক চাপকে। কিন্তু এই ধরনের আচরণের পেছনে শারীরিক কারণও থাকতে পারে।
শরীরে কিছু নির্দিষ্ট পুষ্টির অভাব থাকলে মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার বা রাসায়নিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়, যার ফলে খিটখিটে মেজাজ বা সিভিয়ার ইরিটেবিলিটি দেখা দিতে পারে।
কোন কোন পুষ্টির অভাবে এমন হতে পারে?
ম্যাগনেসিয়াম
ম্যাগনেসিয়াম শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ, যাকে বলা হয় ‘প্রাকৃতিক ট্র্যাঙ্কুইলাইজার’। এটি উদ্বেগ ও উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করে। এর অভাবে উদ্বেগ, অনিদ্রা এবং অতিরিক্ত রাগ দেখা দিতে পারে।
ম্যাগনেসিয়ামের উৎস: পালংশাক, কুমড়োর বীজ, কাজু বাদাম, ডার্ক চকলেট ইত্যাদি।
ভিটামিন বি কমপ্লেক্স
বিশেষ করে বি৬, বি৯ এবং বি১২ সেরোটোনিন বা ‘সুখ হরমোন’ তৈরিতে সাহায্য করে। এর অভাবে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেতে পারে।
উৎস: ডিম, দুধ, মাংস, সবুজ শাকসবজি, ডাল।
ভিটামিন ডি
ভিটামিন ডি-কে বলা হয় ‘সানশাইন ভিটামিন’। এটি সূর্যের আলো থেকে পাওয়া যায় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর অভাবে বিষণ্ণতা ও মেজাজের ওঠানামা দেখা দিতে পারে।
উৎস: সূর্যালোক, চর্বিযুক্ত মাছ, ডিমের কুসুম।
জিঙ্ক
জিঙ্ক মস্তিষ্কের সিগন্যাল আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর অভাবে খিটখিটে ভাব ও ক্লান্তি বাড়তে পারে।
উৎস: কুমড়োর বীজ, সামুদ্রিক মাছ, লাল মাংস, দানাশস্য।
ওমেগা-৩
এটি ভিটামিন নয়, তবে মস্তিষ্কের কোষ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। এর অভাবে মেজাজ খিটখিটে হতে পারে।
উৎস: সামুদ্রিক মাছ (ইলিশ, কাতলা, মাগুর), তিল, তিসি, আখরোট।

আয়রন
আয়রনের অভাব বা রক্তাল্পতায় মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়, ফলে বিরক্তিভাব দেখা দিতে পারে।
উৎস: ডুমুর, থানকুনি পাতা, বিভিন্ন শাক, বেদানা।
কীভাবে সমাধান করবেন?
রক্ত পরীক্ষা
নিজে থেকে সাপ্লিমেন্ট না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে দেখুন ভিটামিন ডি, বি১২ বা আয়রনের ঘাটতি আছে কি না।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রোটিন, রঙিন সবজি এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রাখুন। অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো রক্তে শর্করার ওঠানামা ঘটিয়ে মেজাজে প্রভাব ফেলতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম ও পানি পান
ঘুমের ঘাটতি ও ডিহাইড্রেশন খিটখিটে মেজাজের অন্যতম কারণ। প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন।
সূর্যালোক
প্রতিদিন ১৫–২০ মিনিট সূর্যের আলোতে থাকুন, যা প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরি করতে সাহায্য করে।
মনে রাখা জরুরি
ভালো খাবার ও পর্যাপ্ত ঘুমের পরেও যদি মেজাজ নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ ‘সিভিয়ার ইরিটেবিলিটি’-র পেছনে মানসিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


