সম্পাদকীয় | সুরাঙ্গন নিউজ
হাজার হাজার মাইল দূরে আমেরিকার মাটিতে বসবাস করলেও বাংলা ভাষা আমাদের শিকড়, পরিচয় ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আমরা যারা বাংলাদেশ কিংবা ভারতের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল থেকে নানা স্বপ্ন ও সম্ভাবনার সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছি, তাদের জীবনে নতুন দেশ নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। আমরা এখানে কাজ করছি, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ছি, ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হচ্ছি এবং আমেরিকান সমাজের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করছি। কিন্তু এই নতুন জীবনের সঙ্গে আমাদের পুরোনো শিকড়ের সম্পর্ক যেন হারিয়ে না যায় – সেই দায়িত্বও আমাদের।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষাকে পৌঁছে দেওয়া এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ব। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কিংবা ছোটবেলা থেকে এখানে বেড়ে ওঠা অনেক বাঙালি শিশুর দৈনন্দিন জীবনের প্রধান ভাষা ইংরেজি। স্কুল, বন্ধু, খেলাধুলা, প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবখানেই ইংরেজির প্রাধান্য। ফলে অনেক শিশু বাংলা বুঝলেও সাবলীলভাবে বলতে পারে না; কেউ কেউ পড়তে বা লিখতেও পারে না।
এ জন্য সন্তানদের দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত আমরা তাদের বাংলা শেখার কতটা সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করছি?
বাংলা ভাষার চর্চার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো পরিবার। বাবা-মা যদি সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত বাংলায় কথা বলেন, প্রতিদিনের ছোট ছোট কথোপকথনে বাংলা ব্যবহার করেন, তাহলে ভাষার ভিত সহজেই তৈরি হতে পারে। খাবারের টেবিলে গল্প করা, দাদা-দাদি বা নানা-নানির সঙ্গে বাংলায় কথা বলার উৎসাহ দেওয়া, বাংলা গল্প ও কবিতা পড়ে শোনানো কিংবা বাংলা গান শোনানো এসব ছোট উদ্যোগই শিশুর মনে ভাষার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে পারে।
বাংলা শেখাকে কখনোই বাড়তি বোঝা বা শাস্তির বিষয় করা উচিত নয়। শিশুরা ভুল করবে, উচ্চারণে সমস্যা হবে, বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। তাদের নিরুৎসাহিত না করে উৎসাহ দিতে হবে। ভাষা শেখার সঙ্গে আনন্দকে যুক্ত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলা স্কুল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাহিত্যচর্চার আসর ও কমিউনিটি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহান্তে বাংলা ক্লাসের পাশাপাশি গল্প বলা, কবিতা আবৃত্তি, গান, নাটক, বাংলা বই পড়া, ছবি আঁকা এবং শব্দের খেলার মাধ্যমে শিশুদের বাংলা শেখানো যেতে পারে। প্রযুক্তিকেও কাজে লাগাতে হবে। বাংলা অডিওবুক, ভিডিও, ই-বুক ও শিশুদের উপযোগী অনলাইন কনটেন্ট তাদের ভাষার সঙ্গে সহজে যুক্ত করতে পারে।
প্রবাসী বাংলা সংবাদপত্রেরও রয়েছে বিশেষ দায়িত্ব। নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের লেখা, কবিতা, গল্প ও অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এতে তারা শুধু বাংলা পড়বে না, বাংলায় নিজেদের প্রকাশ করতেও শিখবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলা শেখানোর উদ্দেশ্য সন্তানদের কেবল পরীক্ষায় ভালো করানো নয়। বাংলা ভাষার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, লোকসংগীত, লোককথা এবং আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের।
আমাদের সন্তানরা আমেরিকান সমাজের অংশ হবে এটাই স্বাভাবিক। তারা ইংরেজিতে দক্ষ হবে, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে। তার পাশাপাশি যদি তারা বাংলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারে, বাংলা গান বুঝতে পারে, একটি বাংলা বই পড়তে পারে এবং নিজের শিকড় সম্পর্কে জানতে পারে, তাহলে সেটিই হবে আমাদের বড় অর্জন।
প্রবাস বদলেছে আমাদের ঠিকানা, কিন্তু আমাদের শিকড় বদলায়নি। সেই শিকড়ের সঙ্গে আগামী প্রজন্মের সেতুবন্ধন তৈরি করাই আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। বাংলা ভাষা বেঁচে থাকুক ঘরে, পরিবারে, সমাজে এবং নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে।


