অলিভ অয়েল, লেগিউম-ভিত্তিক পাস্তা ও ওটস– ছোট খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনেই হতে পারে বড় স্বাস্থ্যসুরক্ষা
Kelsey Kunik, Registered Dietitian and Health Journalist
হৃদযন্ত্রের যত্ন নিতে কি প্রতিদিনের খাবারেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে? উত্তর হলো-অবশ্যই নয়। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার সবচেয়ে সহজ উপায় হতে পারে নিজের রান্নাঘর থেকেই শুরু করা। প্রতিদিনের খাবারে কয়েকটি পুষ্টিকর উপাদান যোগ করা এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে আনা দীর্ঘমেয়াদে হৃদস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হৃদযন্ত্র আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রতিদিন এটি বিপুল পরিমাণ রক্ত সারা শরীরে সঞ্চালন করে, যার মাধ্যমে কোষ ও অঙ্গগুলো অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হৃদরোগ এখনও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ভূমধ্যসাগরীয় (Mediterranean) খাদ্যাভ্যাস এবং ড্যাশ (DASH) খাদ্যাভ্যাস হৃদস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে উপকারী। এসব খাদ্যাভ্যাসে শাকসবজি, ফল, সম্পূর্ণ শস্য, ডাল ও শিমজাতীয় খাবার, বাদাম এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, পরিশোধিত শস্য এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা রান্নাঘরে সহজলভ্য ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য কয়েকটি খাবার রাখার পরামর্শ দেন। এর মধ্যে তিনটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১. অলিভ অয়েল: হৃদস্বাস্থ্যবান্ধব চর্বির সহজ উৎস
রান্নার তেল বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে অলিভ অয়েল হতে পারে একটি ভালো বিকল্প। সবজি রোস্ট করা, সালাদ ড্রেসিং, ম্যারিনেড কিংবা রান্নার শেষে খাবারের ওপর অল্প পরিমাণ ছড়িয়ে দিতে এটি ব্যবহার করা যায়।
অলিভ অয়েলে রয়েছে মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, পলিফেনল ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। গবেষণায় অলিভ অয়েল গ্রহণের সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি কমার একটি ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল (EVOO) তুলনামূলকভাবে কম প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য বায়োঅ্যাকটিভ উদ্ভিদজাত উপাদান বেশি থাকে।

তবে মনে রাখতে হবে, অলিভ অয়েল স্বাস্থ্যকর চর্বি হলেও এটি ক্যালরিসমৃদ্ধ। তাই ‘স্বাস্থ্যকর’ ভেবে অতিরিক্ত পরিমাণে ব্যবহার না করে পরিমিতভাবে খাওয়াই ভালো।
২. লেগিউম-ভিত্তিক পাস্তা: পাস্তা খাবেন, পুষ্টিও পাবেন
হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে পাস্তা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ডাল, ছোলা, মসুর, মুগ, এডামামে বা কালো শিমের মতো লেগিউম দিয়ে তৈরি পাস্তা হতে পারে প্রচলিত পরিশোধিত গমের পাস্তার একটি পুষ্টিকর বিকল্প।
এ ধরনের পাস্তায় সাধারণত প্রোটিন ও ফাইবারের পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে খাবারের পর দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকার অনুভূতি তৈরি হয় এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ডাল ও শিমজাতীয় খাবারের দ্রবণীয় ফাইবার রক্তের এলডিএল (LDL) বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখতে এবং সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে।
যারা নিয়মিত ডাল বা শিমজাতীয় খাবার খাদ্যতালিকায় যোগ করতে পারছেন না, তাদের জন্য লেগিউম-ভিত্তিক পাস্তা সহজ একটি বিকল্প হতে পারে।
৩. ওটস: সকালের নাস্তায় হৃদযন্ত্রের বন্ধু
সকালের নাস্তায় এক বাটি ওটমিল শুধু পেট ভরানোর খাবার নয়- এটি হৃদস্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে। ওটসে রয়েছে দ্রবণীয় ফাইবার এবং বিটা-গ্লুকান, যা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
বিটা-গ্লুকান অন্ত্রে কোলেস্টেরলের শোষণ ও বিপাক প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ওটসে থাকা অন্যান্য উদ্ভিদজাত উপাদানও হৃদস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য উপকার বয়ে আনে।
তবে সব ধরনের ওটস সমান নয়। অতিরিক্ত চিনি, ফ্লেভার বা অন্যান্য উপাদানযুক্ত ইনস্ট্যান্ট ওটসের পরিবর্তে হোল-গ্রেইন বা কম প্রক্রিয়াজাত ওটস বেছে নেওয়া ভালো। ওটমিলের পাশাপাশি ওভারনাইট ওটস, স্মুদি বা ঘরে তৈরি ওটস প্যানকেকেও এটি ব্যবহার করা যায়।
হৃদযন্ত্রের যত্ন শুরু হোক আজ থেকেই
হৃদস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কোনো একটি ‘ম্যাজিক’ খাবারের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল, সম্পূর্ণ শস্য, ডাল ও শিমজাতীয় খাবার, বাদাম এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি যুক্ত করাই গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট, প্রক্রিয়াজাত মাংস এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো প্রয়োজন।
অর্থাৎ, হৃদযন্ত্রের যত্ন নেওয়ার পথটি খুব দূরের কোনো বিষয় নয়- শুরু হতে পারে আপনার নিজের রান্নাঘর থেকেই। আজকের বাজারের তালিকায় একটি ভালো মানের অলিভ অয়েল, ওটস কিংবা লেগিউম-ভিত্তিক পাস্তা যোগ করাই হতে পারে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের দিকে একটি ছোট কিন্তু অর্থবহ পদক্ষেপ।
তবে হৃদরোগ, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে ব্যক্তিগত খাদ্য পরিকল্পনার জন্য চিকিৎসক বা নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


