সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে ডায়াবেটিস নিয়েও সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।
পৃথা ঘোষ, হিউস্টন, টেক্সাস
ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা। তবে ডায়াবেটিস ধরা পড়লেই দৈনন্দিন জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে, এমন নয়। কিছু নিয়ম মেনে চললে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রোগজনিত জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
খাবারের দিকে নজর দিন
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য, আঁশসমৃদ্ধ খাবার এবং পরিমিত প্রোটিন রাখা ভালো। ভাত, রুটি বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং পরিমাণ ও খাবারের ধরন সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে দেওয়া উচিত। ফল খাওয়া যায়, তবে ফলের রসের পরিবর্তে গোটা ফল বেছে নেওয়া ভালো। ব্যক্তির বয়স, ওজন, ওষুধ ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে উপযুক্ত খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

প্রতিদিন হাঁটুন ও সক্রিয় থাকুন
নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, শারীরিকভাবে সক্ষম হলে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম যেমন দ্রুত হাঁটা- একটি ভালো লক্ষ্য। শুরুতে প্রতিদিন ১০ – ১৫ মিনিট হাঁটা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো যায়।
দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন। তবে ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমিয়ে দিতে পারে এমন ওষুধ ব্যবহার করলে ব্যায়ামের আগে ও পরে শর্করা কমে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন
কত ঘন ঘন রক্তে শর্করা পরীক্ষা করতে হবে, তা নির্ভর করে ডায়াবেটিসের ধরন, চিকিৎসা এবং শর্করার নিয়ন্ত্রণের ওপর। চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী বাড়িতে গ্লুকোজ পরীক্ষা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে HbA1c পরীক্ষার মাধ্যমে গত দুই থেকে তিন মাসের গড় রক্তশর্করার ধারণা পাওয়া যায়।
একবার খাবারের পর রক্তে শর্করা বেড়ে গেলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। খাবার, ব্যায়াম, মানসিক চাপ ও ঘুমের কারণে শর্করার মাত্রা ওঠানামা করতে পারে। তবে বারবার বেশি মাত্রা পাওয়া গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।

ওষুধ ও ইনসুলিনে নিয়ম মেনে চলুন
চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করুন। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা বিপজ্জনক হতে পারে। খাবার দেরিতে খাওয়া, অতিরিক্ত ব্যায়াম বা নির্ধারিত খাবার বাদ দেওয়ার কারণে কিছু ওষুধ ব্যবহারকারীর রক্তে শর্করা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে।
হাত কাঁপা, ঘাম হওয়া, মাথা ঘোরা, হঠাৎ ক্ষুধা লাগা বা বিভ্রান্তি রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে। সচেতন অবস্থায় শর্করা কমে গেলে চিকিৎসকের নির্দেশিত পদ্ধতি অনুসরণ করুন। অচেতন ব্যক্তিকে মুখে খাবার বা পানীয় দেবেন না; জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিন।
ঘুম, মানসিক চাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণ
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার অংশ। অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা, বিশ্রাম নেওয়া এবং পছন্দের হালকা শারীরিক কার্যকলাপ উপকারী হতে পারে।
ধূমপান এড়িয়ে চলা, অ্যালকোহল সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

পা ও চোখের যত্ন নিন
ডায়াবেটিসে স্নায়ু ও রক্তনালির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রতিদিন পায়ে কাটা, ফোসকা, লালচে ভাব বা ক্ষত আছে কি না পরীক্ষা করুন। পায়ের ক্ষত অবহেলা করবেন না। নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, কিডনির কার্যকারিতা যাচাই, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের নির্ধারিত ফলোআপ বজায় রাখা জরুরি।
কখন দ্রুত চিকিৎসা নেবেন?
অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা বারবার ঝাপসা দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বমি, পেটব্যথা, দ্রুত বা গভীর শ্বাস, তীব্র দুর্বলতা কিংবা বিভ্রান্তি দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কথা: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু রক্তে শর্করার সংখ্যা কমানো নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকা এবং জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা। সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, নির্ধারিত ওষুধ এবং সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এই অভ্যাসগুলোই সুস্থ জীবনের ভিত্তি।
স্বাস্থ্য-সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যের জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসা, খাদ্যতালিকা বা ওষুধের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করুন।


