গবেষণায় উঠে আসছে সচেতনতা, উন্নত রোগনির্ণয় ও জটিল জৈবিক কারণের কথা
পৃথা ঘোষ | হিউস্টন, টেক্সাস
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের মধ্যে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (Autism Spectrum Disorder ASD) শনাক্তকরণের হার গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC)-এর ২০২৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, পর্যবেক্ষণাধীন ১৬টি কমিউনিটির ৮ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে প্রতি ৩১ জনে একজনের অটিজম শনাক্ত হয়েছে। ২০০০ সালের পর্যবেক্ষণে এই হার ছিল প্রতি ১৫০ জনে একজন। তবে এই পরিসংখ্যান সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি শিশুর সরাসরি গণনা নয়; এটি নির্দিষ্ট কমিউনিটিভিত্তিক পর্যবেক্ষণের ফলাফল।
এই পরিবর্তন অভিভাবক, শিক্ষক, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে শিশুদের মধ্যে অটিজম কি সত্যিই আগের তুলনায় বেশি হচ্ছে, নাকি আগে যেসব শিশু শনাক্ত হতো না, এখন তাদেরও রোগনির্ণয়ের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে?
শনাক্তকরণ বৃদ্ধির পেছনে কী কারণ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, উন্নত স্ক্রিনিং পদ্ধতি, রোগনির্ণয়ের মানদণ্ডের পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিষেবায় প্রবেশাধিকারের উন্নতি, এই বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা। আগে যেসব শিশুর আচরণগত বা যোগাযোগগত বৈশিষ্ট্যকে ব্যক্তিগত স্বভাব, কথা বলতে দেরি কিংবা সামাজিক অস্বস্তি হিসেবে দেখা হতো, তাদের অনেকের ক্ষেত্রে এখন আরও নিবিড় মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
অটিজম একটি বিস্তৃত স্পেকট্রাম। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ভাষা, সামাজিক যোগাযোগ, আচরণ, শেখার ক্ষমতা এবং সহায়তার প্রয়োজনীয়তায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকতে পারে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে লক্ষণ স্পষ্ট হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে তা সূক্ষ্ম হতে পারে। ফলে আগে শনাক্ত না হওয়া অনেক শিশুও এখন রোগনির্ণয়ের আওতায় আসছে।
CDC-এর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কমিউনিটিতে অটিজম শনাক্তকরণের হারেও বড় পার্থক্য রয়েছে। এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, কোথাও মূল্যায়ন ও রোগনির্ণয়ের সুযোগ বেশি, আবার কোথাও সেই সুযোগ সীমিত। অর্থাৎ, বেশি শনাক্তকরণের হার মানেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় অটিজমের প্রকৃত ঝুঁকি বেশি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
জেনেটিক ও পরিবেশগত বিষয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
অটিজমের একক কোনো কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গবেষণায় জেনেটিক বৈশিষ্ট্যকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি গর্ভাবস্থায় কিছু স্বাস্থ্যগত অবস্থা, নির্দিষ্ট পরিবেশগত সংস্পর্শ, অকালজন্ম এবং অত্যন্ত কম জন্ম-ওজনের মতো বিষয়ের সঙ্গে অটিজমের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে।

তবে কোনো একটি বিষয়ের সঙ্গে অটিজমের পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া মানেই সেটি সরাসরি অটিজমের কারণ এমন নয়। জিনগত ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের পারস্পরিক প্রভাবসহ বিভিন্ন সম্ভাব্য বিষয় নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
টিকা নিয়ে প্রচলিত ধারণা ও বৈজ্ঞানিক তথ্য
অটিজম নিয়ে আলোচনায় শিশুদের টিকাদানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও ভুল ধারণা রয়েছে। কিন্তু বৃহৎ পরিসরের গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় শিশুদের টিকা এবং অটিজমের মধ্যে কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। টিকা দেওয়ার পর কোনো শিশুর অটিজম শনাক্ত হওয়া মানেই টিকার কারণে অটিজম হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
অটিজমের কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা অব্যাহত থাকলেও প্রমাণিত তথ্য ও অনুমানকে আলাদা করে দেখা জরুরি। জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
অভিভাবকদের করণীয়

শিশুর কথা বলতে অস্বাভাবিক বিলম্ব, নাম ধরে ডাকলে ধারাবাহিকভাবে সাড়া না দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগে অসুবিধা, একই আচরণ বারবার করা কিংবা নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ আগ্রহ দেখা গেলে অভিভাবকদের শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। এসব লক্ষণ থাকলেই যে শিশুর অটিজম রয়েছে, তা নয়; সঠিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
শিশুর বিকাশগত উদ্বেগ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষাগত সহায়তা এবং অন্যান্য বিকাশমূলক পরিষেবা শুরু করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের বিকাশ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে যথাসময়ে মূল্যায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সচেতনতা ও সহায়তার গুরুত্ব

অটিজম শনাক্তকরণের হার বৃদ্ধির পেছনে কতটা ভূমিকা রয়েছে উন্নত রোগনির্ণয়, আর কতটা ভূমিকা রয়েছে প্রকৃত ঝুঁকির সম্ভাব্য পরিবর্তনের; তা পুরোপুরি নির্ধারণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো মূল্যায়ন এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহায়তা শিশুদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অটিজমকে কেবল একটি রোগনির্ণয়ের পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে, সংশ্লিষ্ট শিশু ও পরিবারের প্রয়োজন বোঝা এবং উপযুক্ত সহায়তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সমাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
References:
- USA Centers for Disease Control and Prevention (CDC)
- Data and Statistics on Autism Spectrum Disorder;
- Prevalence and Early Identification of Autism Spectrum Disorder Among Children Aged 4 and 8 Years – 2022


