সুরাঙ্গন নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক: ক্যালেন্ডারের পাতায় ২৫ বছর দীর্ঘ সময়। কিন্তু নিউইয়র্কের কাছে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ ‘নাইন-ইলেভেন’ আজও যেন গতকালের ঘটনা। কালো ধোঁয়া, সাইরেনের শব্দ, ধুলোয় ঢাকা মানুষ আর ধ্বংসস্তূপের সেই দৃশ্য আধুনিক বিশ্বের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে আছে।
সেদিন ২,৯৭৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাঁরা ছিলেন বিভিন্ন দেশ, ধর্ম ও পরিচয়ের মানুষ – অফিসকর্মী, অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ কর্মকর্তা, বিমানের যাত্রী, রেস্তোরাঁকর্মী এবং অসংখ্য অভিবাসী। একটি সন্ত্রাসী হামলা মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার পরিবারকে শোকে নিমজ্জিত করেছিল।

নাইন-ইলেভেন শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল না; এটি আমেরিকার নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও নাগরিকজীবনে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে। আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ, কঠোর বিমানবন্দর নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় নজরদারি এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিস্তার- সবকিছুর ওপরই এর গভীর প্রভাব পড়ে।
২৫ বছর পর প্রশ্ন থেকে যায়- সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সেই দীর্ঘ যুদ্ধ কি পৃথিবীকে সত্যিই আরও নিরাপদ করেছে? সন্ত্রাসবাদ নির্মূল হয়নি; বরং সময়ের সঙ্গে তার রূপ ও কৌশল বদলেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধগুলোর মানবিক ও রাজনৈতিক মূল্যও আজও আলোচিত।

নাইন-ইলেভেনের পর সবচেয়ে বড় সামাজিক ক্ষতগুলোর একটি পড়েছিল মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর। একটি সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামকে নিজেদের নামে ব্যবহার করলেও তার দায় কোনোভাবেই বিশ্বের কোটি কোটি নিরপরাধ মুসলমানের নয়। তবু বহু মুসলিম, আরব-আমেরিকান ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী বৈষম্য, সন্দেহ ও সামাজিক চাপের মুখোমুখি হন।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিও সেই পরিবর্তনের সাক্ষী। কিন্তু গত ২৫ বছরে তারা প্রমাণ করেছে- আমেরিকার মূলধারায় সফলভাবে যুক্ত হওয়া এবং নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখা পরস্পরবিরোধী নয়।
আজ গ্রাউন্ড জিরোতে রয়েছে 9/11 Memorial। সেখানে খোদাই করা হাজার হাজার নামের পাশে কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের বিভাজন নেই- আছে শুধু মানুষের নাম। এই স্মৃতিসৌধ তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি মানবতার প্রতিও এক গভীর আহ্বান।
নাইন-ইলেভেন আমাদের শিখিয়েছে, নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু নিরাপত্তার নামে স্বাধীনতা, গোপনীয়তা কিংবা সমানাধিকারের ক্ষতি করা যায় না। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, ভয়কে ঘৃণায় পরিণত করা কত সহজ।

তবে নিউইয়র্ক আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে- ধ্বংসস্তূপ থেকেও একটি শহর উঠে দাঁড়াতে পারে। সেদিন যারা মানুষকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন, তাঁরা ধর্ম বা জাতি জিজ্ঞেস করেননি। মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর পূর্তি তাই শুধু স্মরণের দিন নয়, আত্মজিজ্ঞাসারও দিন। আমরা কি পৃথিবীকে আরও নিরাপদ করেছি, নাকি শুধু আরও ভীত? আমরা কি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে নিরপরাধ মানুষকে সন্দেহ করেছি? ইতিহাস থেকে কি ঘৃণার বদলে মানবিকতার শিক্ষা নিয়েছি?
নিউইয়র্কের আকাশে টুইন টাওয়ার নেই, কিন্তু তাদের স্মৃতি আছে। সেই স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ভবন ধসে যেতে পারে, রাষ্ট্রের শক্তিরও সীমা আছে; কিন্তু মানুষের সাহস, সহমর্মিতা ও একসঙ্গে দাঁড়ানোর ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত একটি শহরকে বাঁচিয়ে রাখে।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকব, কিন্তু ঘৃণার কাছে আত্মসমর্পণ করব না।
এই হোক নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর পর আমাদের অঙ্গীকার।


