‘ভূতুড়ে কণা’র খোঁজে দক্ষিণ মেরুর বরফে গবেষণাগার
সুরাঙ্গন নিউজ ডেস্ক: মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় কণাগুলোর একটি নিউট্রিনো। প্রায় কোনও কিছুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া না করেই কোটি কোটি আলোকবর্ষ পথ পাড়ি দিতে পারে এই কণা। সেই ‘ভূতুড়ে কণা’র সন্ধান এবং মহাজাগতিক উৎস শনাক্ত করার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেলেন বেলজিয়ান-মার্কিন বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন।
রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস মঙ্গলবার তাঁর নাম ঘোষণা করে। নোবেল কমিটির মতে, দক্ষিণ মেরুর Ice Cube Neutrino Observatory-তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং জ্যোতির্পদার্থবৈজ্ঞানিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্যই হালজেনকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে।
নিউট্রিনোর বৈদ্যুতিক আধান নেই এবং এর ভর অত্যন্ত সামান্য। সাধারণ পদার্থের সঙ্গে এদের মিথস্ক্রিয়াও খুব দুর্বল। ফলে প্রতি মুহূর্তে বিপুলসংখ্যক নিউট্রিনো পৃথিবী ও মানুষের শরীর ভেদ করে চলে গেলেও আমরা তা টের পাই না। কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যই নিউট্রিনোকে মহাবিশ্বের দূরবর্তী উৎস সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার অসাধারণ মাধ্যম করে তুলেছে।
হালজেনের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ মেরুর প্রায় ১.৫ থেকে ২.৫ কিলোমিটার গভীর বরফকে বিশাল নিউট্রিনো ডিটেক্টর হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বরফের নিচে প্রায় এক ঘনকিলোমিটার এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে ৮৬টি তার, যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৫,১৬০টি ডিজিটাল অপটিক্যাল মডিউল (DOM)। এগুলো বরফের ভেতরে নিউট্রিনোর সংঘর্ষে তৈরি অত্যন্ত ক্ষীণ আলোর সংকেত শনাক্ত করে।
কোনও উচ্চশক্তির নিউট্রিনো বরফের পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষ করলে দ্রুতগতির মিউয়ন তৈরি হতে পারে। এই মিউয়ন বরফের মধ্য দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় নীল আলোর ঝলক তৈরি করে, যাকে বলা হয় চেরেঙ্কভ বিকিরণ। Ice Cube-এর সেন্সরগুলো সেই আলো শনাক্ত করে নিউট্রিনোর দিক ও শক্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে।
২০১৩ সালে Ice Cube মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর শক্তিশালী প্রমাণ দেয়। এর মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানে তৈরি হয় নতুন এক ক্ষেত্র নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান। এখন নিউট্রিনোর সাহায্যে ব্ল্যাক হোল, সক্রিয় ছায়াপথের কেন্দ্র এবং মহাবিশ্বের অন্যান্য শক্তিশালী উৎস সম্পর্কে নতুন তথ্য অনুসন্ধান করা সম্ভব হচ্ছে।
১৯৪৪ সালের ২৩ মার্চ বেলজিয়ামের তিয়েনে জন্মগ্রহণ করেন ফ্রান্সিস হালজেন। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের University of Wisconsin–Madison-এর অধ্যাপক। নোবেল পুরস্কার হিসেবে তিনি পাবেন ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার।
দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে তৈরি এই অনন্য গবেষণাগার মহাবিশ্বকে দেখার মানুষের নতুন এক ‘চোখ’ হয়ে উঠেছে, আর সেই অভিযানের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক হিসেবে নোবেল স্বীকৃতি পেলেন হালজেন।



