সুরাঙ্গন নিউজ ডেস্ক : এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া-উৎসবের নাম ছিল ফিফা বিশ্বকাপ। এখন শেষ বাঁশি বেজেছে। ট্রফি উঠেছে নতুন চ্যাম্পিয়নের হাতে। স্টেডিয়ামের আলো ধীরে ধীরে নিভছে, গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে রঙিন পতাকা। কিন্তু বিশ্বকাপ কি সত্যিই শেষ?
হয়তো মাঠের খেলা শেষ হয়েছে, কিন্তু মানুষের ভেতরে তৈরি হওয়া আবেগ, স্মৃতি ও ঐক্যের অনুভূতি এত সহজে শেষ হওয়ার নয়।
পৃথিবীতে এমন আয়োজন খুব কমই আছে, যা একই সময়ে কোটি কোটি মানুষকে একই আবেগে যুক্ত করতে পারে। ভাষা আলাদা, ধর্ম ও সংস্কৃতি আলাদা, রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা—তবুও একটি বল, একটি গোল আর ৯০ মিনিটের খেলাকে কেন্দ্র করে মানুষ একই সঙ্গে হাসে, কাঁদে, উল্লাস করে, আবার হতাশও হয়। বিশ্বকাপ বারবার মনে করিয়ে দেয়—মানুষের মিলগুলো আসলে বিভেদের চেয়ে অনেক বড়।

এবারের বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম নয়। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তের মানুষ কোনো না কোনো দলের সমর্থক হয়েছেন। যারা নিজেদের দেশের দলকে পাননি, তারাও প্রিয় খেলোয়াড়, দলের ইতিহাস কিংবা ফুটবল দর্শনের সঙ্গে নিজেদের আবেগকে যুক্ত করেছেন। ফুটবল তাই শুধু একটি খেলা নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক বৈশ্বিক ভাষা।
নিউইয়র্ক, ঢাকা, বুয়েনস আইরেস, মাদ্রিদ, কায়রো, টোকিও কিংবা লাগোস দৃশ্য প্রায় একই। বিশাল পর্দার সামনে হাজারো মানুষ। কারও কাঁধে পতাকা, কারও মুখে দলের রং, কেউ আবার অচেনা মানুষের সঙ্গে গোল উদযাপনে আলিঙ্গন করছেন।
রাজনীতি যেখানে প্রায়ই মানুষকে বিভক্ত করে, ফুটবল সেখানে কিছু সময়ের জন্য হলেও মানুষকে কাছে নিয়ে আসে।
বিশ্বকাপের বড় শক্তি এখানেই। এটি মানুষকে প্রতিদ্বন্দ্বী বানায়, শত্রু নয়। মাঠে তীব্র লড়াই থাকে, কিন্তু খেলা শেষে থাকে করমর্দন, আলিঙ্গন ও প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান। আজকের বিভক্ত পৃথিবীতে এই সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বিশ্বকাপের আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। ফুটবল এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনোদন ও বাণিজ্যিক শিল্প। সম্প্রচারস্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পন্সরশিপ, জার্সি বিক্রি, পর্যটন, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ একটি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান।
কিন্তু এখানেই একটি প্রশ্ন উঠে আসে যে শ্রমিক বিশ্বকাপের জার্সি তৈরি করেন, তিনি কি সেই জার্সি কেনার সামর্থ্য রাখেন? যে স্বেচ্ছাসেবক দিন-রাত কাজ করেন, তিনি হয়তো কোনো দিন ভিআইপি বক্সে বসে খেলা দেখার সুযোগ পান না। যে শিশু কাপড়ের বল দিয়ে খেলতে খেলতে বড় হয়, সে হয়তো কোনো দিন বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামে পৌঁছাতে পারে না।
এই বৈপরীত্য আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতা। তবুও ফুটবলের সৌন্দর্য হলো—মাঠে অন্তত অর্থ বা সামাজিক অবস্থান নয়, প্রতিভা, পরিশ্রম ও দলগত ঐক্যই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। ফুটবল মানুষকে স্বপ্ন দেখায়—যোগ্যতা অনেক সময় জন্মপরিচয়ের সীমা অতিক্রম করতে পারে।
এই বিশ্বকাপ আমাদের আরও একটি শিক্ষা দিয়েছে বড় সাফল্যের পেছনে অসংখ্য নীরব মানুষের অবদান থাকে।
হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক, কর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, পরিবহনকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও আয়োজক দিনের পর দিন কাজ করেছেন। ক্যামেরা তাদের খুঁজে বেড়ায়নি, সংবাদ শিরোনামেও তারা আসেননি। অথচ তাদের শ্রম ছাড়া এত বড় আয়োজন সম্ভব হতো না।

প্রযুক্তিও বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতাকে বদলে দিয়েছে। পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে থাকা দর্শক মুহূর্তের মধ্যেই অন্য প্রান্তের উল্লাসের অংশ হয়ে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি গোল, অসাধারণ সেভ, কান্না কিংবা আলিঙ্গনকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কোটি মানুষের অনুভূতিতে পরিণত করেছে।
তবে ফুটবল আমাদের আরেকটি গভীর শিক্ষা দেয় জয় চিরস্থায়ী নয়, পরাজয়ও নয়।
আজকের চ্যাম্পিয়নকে আগামীকাল আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। আর আজ যে দল হেরে মাঠ ছাড়ল, আগামীবার সেই দলই হয়তো ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে। খেলাধুলার এই দর্শন জীবনের সঙ্গেও মিলে যায়। সাফল্য যেমন চিরস্থায়ী নয়, ব্যর্থতাও শেষ কথা নয়।
বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে, কিন্তু পৃথিবী এখনো অশান্ত। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও ক্ষুধা, কোথাও জলবায়ু সংকট, কোথাও ঘৃণার রাজনীতি। এমন এক সময়ে ফুটবল আমাদের কয়েক সপ্তাহের জন্য হলেও মনে করিয়ে দিয়েছে—মানুষ চাইলে একসঙ্গে আনন্দ করতে পারে, একসঙ্গে স্বপ্ন দেখতে পারে।
হয়তো এটাই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় জয়।
ট্রফি একজন অধিনায়কের হাতে ওঠে, কিন্তু উৎসবটি হয়ে যায় পুরো পৃথিবীর। শেষ বাঁশি বাজলেও আনন্দ, কান্না, স্মৃতি এবং মানবিক সংযোগ থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে।
বিশ্বকাপ তাই শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়; এটি এক বিরল বৈশ্বিক মিলনমেলা যেখানে ভাষার অনুবাদ লাগে না, সীমান্তের পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে না, আর কোটি কোটি মানুষ একই মুহূর্তে একই আবেগে স্পন্দিত হয়।
পরবর্তী বিশ্বকাপের অপেক্ষা হয়তো আজ থেকেই শুরু। কিন্তু সেই অপেক্ষার মধ্যেও আমাদের মনে রাখা উচিত—ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু ট্রফি জেতা নয়; মানুষকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসা।
বিভক্ত পৃথিবীতে এই শিক্ষা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।


