তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় নতুন গবেষণায় আশার ইঙ্গিত– বয়স্ক মানুষের শরীরও গরমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে
Katarina Zimmer; Science News
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে তাপমাত্রা, ঘন ঘন আসছে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহ। এর সঙ্গে বাড়ছে তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকিও। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং শারীরিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠী অতিরিক্ত গরমের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তবে নতুন কিছু গবেষণা মানুষের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতার দিকে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, শরীরকে ধীরে ধীরে গরমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
গবেষকেরা একে বলছেন ‘হিট অ্যাক্লিমেশন’ বা তাপ-অভিযোজন। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিতভাবে বারবার গরমের সংস্পর্শে এলে শরীর এমন কিছু পরিবর্তন ঘটায়, যা পরবর্তী সময়ে উচ্চ তাপমাত্রা মোকাবিলায় তাকে আরও সক্ষম করে তুলতে পারে।
তরুণ ও সুস্থ মানুষের ওপর দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখা গেছে, গরমের সঙ্গে শরীরের অভিযোজনের ফলে ঘাম আগে শুরু হয় এবং পরিমাণও বাড়ে। একই সঙ্গে ত্বকের রক্তনালি দ্রুত প্রসারিত হয়। এর ফলে শরীরের ভেতরের তাপ ত্বকের দিকে পৌঁছে সহজে বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে শরীর রক্তের পরিমাণও কিছুটা বাড়িয়ে নেয়, ফলে হৃদপিণ্ডের ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে কমে আসে।
নতুন গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো; বয়স্ক মানুষের শরীরও কি একইভাবে গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে?
অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বয়স্ক নারী ও পুরুষদের নিয়ে পরিচালিত পরীক্ষায় এর সম্ভাবনাময় প্রমাণ পেয়েছেন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পানিতে নির্দিষ্ট সময় ধরে রাখা হয়। এভাবে টানা কয়েক দিন শরীরকে তাপের সংস্পর্শে আনার পর দেখা যায়, বয়স্ক অংশগ্রহণকারীদের শরীরও গরমের প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন দেখাচ্ছে।
গবেষকেরা দেখতে পান, তাপ-অভিযোজনের পর শরীর তুলনামূলক দ্রুত ঘামতে শুরু করছে এবং ত্বকের রক্তনালিগুলো প্রসারিত হচ্ছে। শরীরের গড় তাপমাত্রাও কিছুটা কমেছে এবং হৃদস্পন্দনের হারও কমেছে। অর্থাৎ বয়স বাড়লেও শরীরের তাপের সঙ্গে অভিযোজনের ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।

গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। বারবার গরমের সংস্পর্শে এলে শরীরের কোষ পর্যায়েও পরিবর্তন ঘটতে পারে। গবেষকেরা রক্তের রোগপ্রতিরোধী কোষে ‘হিট শক প্রোটিন’-এর মাত্রা বৃদ্ধির প্রমাণ পেয়েছেন। এসব প্রোটিন তাপ ও অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় চাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কোষীয় প্রোটিনকে স্থিতিশীল রাখতে ও মেরামতে সহায়তা করে।
উষ্ণ আবহাওয়ায় দীর্ঘদিন বসবাসকারী মানুষের মধ্যেও তাপ-অভিযোজনের কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। সৌদি আরবের মক্কার বাসিন্দাদের নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দাদের মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিদেশি তীর্থযাত্রীদের তুলনায় কিছুটা বেশি। গবেষকেরা মনে করছেন, পরিবেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অভ্যস্ততা এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তবে এর পেছনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, জীবনযাপন, পরিবেশ এবং অন্যান্য জৈবিক কারণও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিচ্ছেন; তাপ-অভিযোজন কোনো জাদুকরী সুরক্ষা নয়। অতিরিক্ত গরমে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতারও সীমা রয়েছে। বিশেষ করে হৃদরোগ, চলাফেরার সমস্যা বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত তাপ-অভিযোজন কতটা নিরাপদ এবং কার্যকর, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষকদের মতে, তাপ-অভিযোজনের সুফল স্থায়ীও নয়। শরীর নিয়মিত গরমের সংস্পর্শে না থাকলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অর্জিত কিছু পরিবর্তন কমে যেতে পারে। অর্থাৎ শরীরকে গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হলে পর্যায়ক্রমে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে তাপের সংস্পর্শে থাকতে হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ও তীব্র হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে এই গবেষণা নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের শরীরকে নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উচ্চ তাপমাত্রার জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হলে, তা ভবিষ্যতের তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় একটি কার্যকর জনস্বাস্থ্য কৌশল হয়ে উঠতে পারে।
তবে গবেষকেরা এখনো এর সঠিক মাত্রা, সময়কাল ও নিরাপদ পদ্ধতি নির্ধারণের পর্যায়ে রয়েছেন। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে অতিরিক্ত গরমে থাকার বা তাপ-অভিযোজনের কোনো পদ্ধতি অনুসরণ না করাই নিরাপদ।
বিজ্ঞানীদের বার্তা আপাতত স্পষ্ট; মানবদেহ গরমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সেই প্রাকৃতিক সক্ষমতাকে কীভাবে নিরাপদভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিই এখন গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।


