ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপে অন্ধকার পদার্থ, অন্ধকার শক্তি থেকে ভিনগ্রহ – মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত
সুরাঙ্গন নিউজ ডেস্ক: মহাবিশ্বকে দেখার পদ্ধতিই বদলে দিতে যাচ্ছে নাসার নতুন প্রজন্মের ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ’। প্রায় দুই দশকের নকশা, নির্মাণ ও পরীক্ষার পর টেলিস্কোপটি গত ৩০ আগস্ট মহাকাশে যাত্রা শুরু করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী বছরের শুরু থেকেই এটি বিপুল পরিমাণ নতুন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য পাঠাতে শুরু করবে।
আকারে একটি ট্যুর বাসের মতো এবং ওজনে প্রায় একটি Tyrannosaurus rex-এর সমান এই মহাকাশ মানমন্দিরের নামকরণ করা হয়েছে নাসার প্রথম প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ন্যান্সি গ্রেস রোমানের নামে। তিনি হাবল স্পেস টেলিস্কোপ বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা ছিলেন।
বিজ্ঞানীদের আশা, প্রথম পাঁচ বছরের পর্যবেক্ষণেই রোমান স্পেস টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের দুটি বড় রহস্য: অন্ধকার পদার্থ (Dark Matter) ও অন্ধকার শক্তি (Dark Energy) সম্পর্কে নতুন তথ্য দেবে। পাশাপাশি এটি কয়েক হাজার নয়, লক্ষাধিক সম্ভাব্য বহির্গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত করতে পারে, গ্যালাক্সিগুলোর পারস্পরিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করবে এবং বিস্ফোরিত নক্ষত্রের সন্ধান দেবে।
নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির কসমোলজিস্ট জেসন রোডসের ভাষায়, রোমান আকাশের যেদিকেই তাকাবে, সেখান থেকেই নতুন কোনো আবিষ্কারের সম্ভাবনা থাকবে। তার মতে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই টেলিস্কোপের প্রভাব পড়তে পারে।
হাবলের চেয়ে ১০০ গুণ বড় দৃষ্টিক্ষেত্র
রোমান টেলিস্কোপের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশাল ফিল্ড অব ভিউ বা দৃষ্টিক্ষেত্র। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের তুলনায় রোমানের দৃষ্টিক্ষেত্র প্রায় ১০০ গুণ বড়। ফলে নির্দিষ্ট একটি নক্ষত্র বা গ্যালাক্সিকে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি এটি দ্রুত বিশাল আকাশজুড়ে জরিপ চালাতে পারবে। এই ব্যাপক জরিপই রোমানকে অন্য অনেক মহাকাশ টেলিস্কোপ থেকে আলাদা করবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, বিশাল আকাশ অঞ্চল একসঙ্গে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এমন সব মহাজাগতিক ঘটনা ধরা পড়বে, যেগুলো ছোট পরিসরের পর্যবেক্ষণে চোখ এড়িয়ে যায়।
অন্ধকার মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা
মহাবিশ্বের দৃশ্যমান বস্তু; নক্ষত্র, গ্রহ, গ্যাস ও ধূলিকণা – মহাবিশ্বের মোট পদার্থের খুব সামান্য অংশ। বিপুল পরিমাণ অন্ধকার পদার্থ সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু এর মহাকর্ষীয় প্রভাব গ্যালাক্সি ও মহাজাগতিক কাঠামোর ওপর স্পষ্ট। অন্যদিকে, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, সময়ের সঙ্গে সেই প্রসারণের গতি বাড়ছে। এই ত্বরিত প্রসারণের পেছনে যে অজানা শক্তিকে দায়ী করা হয়, সেটিই অন্ধকার শক্তি। রোমান এই রহস্য অনুসন্ধানে লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সির ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করবে। অন্ধকার পদার্থের মহাকর্ষ দূরের গ্যালাক্সির আলো ও আকৃতিতে সামান্য বিকৃতি সৃষ্টি করে। এই বিকৃতির ধরন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অদৃশ্য পদার্থের বিস্তৃতি ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
টেলিস্কোপটি প্রায় ২১ হাজার নক্ষত্র বিস্ফোরণ বা সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এসব বিস্ফোরণের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে মহাকাশের দূরত্ব মাপা সম্ভব। একই সঙ্গে রোমান কোটি কোটি গ্যালাক্সির অবস্থান ও বিন্যাসের মানচিত্র তৈরি করবে। এসব তথ্য অন্ধকার শক্তি সম্পর্কে বর্তমান ধারণাগুলোকে আরও শক্তিশালী করবে, নাকি নতুন কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে- তার উত্তর খুঁজতে সাহায্য করতে পারে।
সন্ধান মিলতে পারে হাজার হাজার ভিনগ্রহের
রোমানের আরেকটি বড় প্রকল্প হলো এক্সোপ্ল্যানেট অনুসন্ধান। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের বাইরে ৬ হাজারের কিছু বেশি গ্রহ শনাক্ত করেছেন। রোমান এই সংখ্যা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এ জন্য টেলিস্কোপটি দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করবে – ট্রানজিট ও মাইক্রোলেন্সিং।
ট্রানজিট পদ্ধতিতে কোনো গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার সময় নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা সামান্য কমে যায়। সেই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে গ্রহের অস্তিত্ব শনাক্ত করা যায়। এই পদ্ধতিতে রোমান বিপুলসংখ্যক নতুন গ্রহ খুঁজে পেতে পারে।
অন্যদিকে, মাইক্রোলেন্সিং পদ্ধতিতে কোনো নক্ষত্রের মহাকর্ষ যখন তার পেছনের নক্ষত্রের আলোকে বাঁকিয়ে দেয়, তখন সাময়িক উজ্জ্বলতা দেখা যায়। সামনে থাকা নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণরত কোনো গ্রহ থাকলে সেই আলোয় অতিরিক্ত ক্ষুদ্র পরিবর্তন ঘটে। তা বিশ্লেষণ করে গ্রহটির আকার ও কক্ষপথ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই পদ্ধতিতে রোমান এমন গ্রহও শনাক্ত করতে পারবে, যেগুলো তাদের নক্ষত্র থেকে তুলনামূলক দূরে অবস্থান করছে। এর ফলে আমাদের সৌরজগত কতটা সাধারণ বা ব্যতিক্রমী, সে সম্পর্কেও নতুন ধারণা তৈরি হতে পারে।
শুধু দূর মহাবিশ্ব নয়, নজরে থাকবে আমাদের গ্যালাক্সিও
রোমানের অনুসন্ধান শুধু দূরবর্তী মহাবিশ্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি কৃষ্ণগহ্বরের কাছে নক্ষত্র ছিন্নভিন্ন হওয়া, দ্রুতগতির গ্রহাণু এবং পরিবর্তনশীল নক্ষত্রের মতো নানা মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করবে। বিশেষ গুরুত্ব পাবে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্র ও বাল্জ অঞ্চল। এই এলাকায় গ্যালাক্সির বিপুলসংখ্যক নক্ষত্র রয়েছে, কিন্তু ধূলিকণার ঘন স্তরের কারণে অধিকাংশ টেলিস্কোপের পক্ষে অঞ্চলটি পরিষ্কারভাবে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। রোমানের নতুন প্রযুক্তি এই অপেক্ষাকৃত কম-অনুসন্ধান করা অঞ্চল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। তবে বিজ্ঞানীদের কাছে রোমানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এমন আবিষ্কার, যার কোনো পূর্বাভাস এখনো দেওয়া যায়নি। জ্যোতির্পদার্থবিদ জুলি ম্যাকএনারির ভাষায়, বিজ্ঞানীরা অপেক্ষা করছেন সেই “পরম বিস্ময়গুলোর” জন্য- যেসব আবিষ্কারের এখনো কোনো নাম নেই, কারণ সেগুলো এখনো আবিষ্কৃতই হয়নি। পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে নিজের নির্ধারিত অবস্থানে পৌঁছে রোমানকে সম্পূর্ণভাবে স্থাপন ও চালু করতে কয়েক মাস সময় লাগবে। এরপর শুরু হবে মহাবিশ্বের এক অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক জরিপ।
বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশা, ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ শুধু নতুন ছবি তুলবে না- এটি মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণাকেই নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি করতে পারে। আর সেই অপ্রত্যাশিত আবিষ্কারগুলোই হয়তো আগামী কয়েক দশকের মহাকাশ গবেষণার নতুন দিক নির্ধারণ করবে।


