খালেদ জুলফিকার খান
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমরা বিশ্বকবি, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে জানি। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর অসাধারণ রসবোধ। তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি, শব্দের চমৎকার ব্যবহার এবং সহজ-সরল হাস্যরস দিয়ে তিনি আশপাশের মানুষকে মুহূর্তেই আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারতেন। তাঁর জীবনের এমন কয়েকটি মজার ঘটনা আজও সমানভাবে উপভোগ্য।
১. এক দোলপূর্ণিমার দিনে কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা হয়। পরস্পরের শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর দ্বিজেন্দ্রলাল হঠাৎ পকেট থেকে আবির বের করে রবীন্দ্রনাথকে রাঙিয়ে দিলেন।
রাগ না করে রবীন্দ্রনাথ হেসে বললেন, “এত দিন জানতাম দ্বিজেনবাবু হাসির গান ও নাটক লিখে সকলের মনোরঞ্জন করেন। আজ দেখছি, শুধু মনোরঞ্জন নয়, দেহরঞ্জনেও তিনি একজন ওস্তাদ!” উপস্থিত সকলে তাঁর এই রসিকতায় হেসে উঠেছিলেন।
২. একদিন রবীন্দ্রনাথ ছাত্রছাত্রীদের সামনে গান গাইছিলেন “হে মাধবী, দ্বিধা কেন?” ঠিক সেই সময় ভৃত্য বনমালী এক প্লেট আইসক্রিম নিয়ে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। কবির গান চলায় সে বুঝতে পারছিল না, ভেতরে ঢুকবে কি না।
শেষ পর্যন্ত বনমালী চুপচাপ আইসক্রিমের প্লেট রেখে বেরিয়ে গেল। গান থামিয়ে রবীন্দ্রনাথ মুচকি হেসে বললেন—
“বনমালীকে যদিও মাধবী বলা চলে না, তবে তার দ্বিধা মাধবীর মতোই ছিল। আর আইসক্রিমের প্লেট নিয়ে দ্বিধা করা মোটেই ভালো নয়।” সবাই তাঁর এই তাৎক্ষণিক মন্তব্যে হাসিতে ফেটে পড়েন।
৩. জীবনের শেষদিকে রবীন্দ্রনাথ সামনের দিকে ঝুঁকে লিখতেন। এক শুভানুধ্যায়ী তাঁকে বললেন “আপনি এভাবে লিখতে কষ্ট পান। এখন এমন আরামদায়ক চেয়ার পাওয়া যায়, যেখানে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে লেখা যায়।”
রবীন্দ্রনাথ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু হেসে বললেন “তা তো পারি। তবে কি জানো, এখন উপুড় হয়ে না লিখলে কি আর লেখা বেরোয়! পাত্রের জল কমে তলায় ঠেকলে একটু উপুড় তো করতেই হয়।” বার্ধক্যকে নিয়েও এমন আত্মরসিক মন্তব্য কেবল তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল।
৪. একদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুধাকান্ত রায়চৌধুরীর সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। হঠাৎ গুরুদেব ব্যথায় কাতর হয়ে উঠলেন। সুধাকান্তবাবু উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁর দিকে তাকাতেই রবীন্দ্রনাথ নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “আচ্ছা বলো তো, পা-কে ‘চরণকমল’ বা ‘পাদপদ্ম’ কেন বলা হয়, জানো?” অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে সুধাকান্তবাবু বিস্মিত হয়ে গেলেন। এদিকে রবীন্দ্রনাথ পায়ের মোজা খুলতে খুলতে মৃদু হেসে বললেন, “তা যদি না-ই হয়, তবে শরীরের এত জায়গা থাকতে মৌমাছিটা মোজা ভেদ করে পায়ের একেবারে তলাতেই হুল ফুটাল কেন? নিশ্চয়ই ও ভেবেছে, ওখানেই পদ্মফুল ফুটে আছে!” ব্যথার মুহূর্তেও তাঁর এমন উপস্থিত বুদ্ধি ও নির্মল রসবোধে সুধাকান্তবাবুসহ উপস্থিত সবাই হেসে উঠেছিলেন।


