মৃণাল চৌধুরী
স্বপ্ন বলব না ভাবনা! বলা ভালো দুটোর মিশ্রণ। বিষয়ে যাবার বা অবতারণার আগে দরকার খানিক উপক্রমণিকা। সেটা সেরে ফেলা যাক।
পাঠক, আমার জন্ম পরাধীন ভারতে, তাও আবার এক সঙ্ঘাতপূর্ণ উত্তাল দশকের প্রাক মূহুর্তে, সময়টা তখন দ্বিতীয় বা এখন পর্যন্ত শেষ বিশ্বযুদ্ধ যুদ্ধ শুরু হয়ে দ্বিতীয় মাসে পড়েছে। তারপর আমার শৈশব জুড়ে ঘটতে চলেছিল একের পর এক ইতিহাসের সৃষ্টি। বাঙলা তথা বিশ্বসাহিত্যের অনির্বাণ আলো রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হবেন, মৃত্যুর আগে লিখে যাবেন ‘সভ্যতার সঙ্কট’। মানব সভ্যতার ওপর এক অসামান্য দলিল।
নেতাজী সুভাষের মহা নিষ্ক্রমণ, আজাদ হিন্দ বাহিনী নিয়ে ইংরেজ শাষণ ও শোষণের শেষ ডঙ্কা বাজানো, ক্ষিপ্ত ইংরেজদের মরণ কামড় – উইনস্টন চার্চিলের চক্রান্তে প্রায় তিরিশ থেকে চল্লিশ লক্ষ মানুষ মারার দুর্ভিক্ষ, “ভারত ছাড়ো” আন্দোলন, হিটলার, মুসোলিনি, তোজোদের পতন, দুরপনেয় বহু ক্ষত নিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি, তড়িঘড়ি ভারত ভাগের ব্যবস্থা, অভূতপূর্ব সাম্প্রদায়িক হত্যালীলার স্বাক্ষর নিয়ে ভূ মানচিত্রে ‘স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তানের’ প্রবেশ, ১৫ ই আাগস্টে জহরলাল নেহেরুর অবিস্মরণীয় ‘ ট্রিস্ট উইথ ডেস্টিনি’ বক্তৃতা, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নামক বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম রাজনৈতিক নেতা কাম দার্শনিকের হত্য। পৃথিবীর বৃহত্তম গনতান্ত্রিক দলিল হিসাবে ভারতের সংবিধানের আত্মপ্রকাশ। এসবের মাঝে আছে আরও অনেক ছোট ছোট ডিফাইনিং মোমেন্ট, আর আছেন গান্ধীবাদী এক আইনজ্ঞ স্বাধীনতা সংগ্রামি, যিনি জন্মসূত্রে কায়স্থ হিন্দু হওয়া সত্বেও স্বেচ্ছায় বহু রাজনৈতিক প্রলোভনকে হেলায় অবজ্ঞা করে নিজের জন্মস্থান পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকত্ব বেছে নেবেন। এই মানুষটিই ঐ চল্লিশের দশকের অস্টম বর্ষে লাহোরে পাকিস্তান কনস্টিটিউয়েনট অ্যাসেম্বলিতে সর্বপ্রথম প্রস্তাব রাখবেন বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাস্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের জন্য। তাঁর প্রস্তাব ক্ষমতামত্ত সংখ্যালঘু উর্দু ভাষী পাকিস্তানী মুসলমান শাসকরা খারিজ করে তার ঠিক চার বছর পরে পৃথিবীর সর্বপ্রথম রক্ত ঝোড়ানো ভাষা আন্দেলনের মুখে পড়ে পিছু হটবে। এবং একই সাথে নিজেদের অজান্তে স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ পুঁতে রাখবে।
এই অসম আত্মপ্রত্যয়ী মানুষটি হলেন আমার মাতামহ ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত, যিনি নিজের পুত্রকে নিয়ে নৃশংস পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হন ১৯৭১তে। এবং আমার মধ্যে রেখে যাবেন তাঁর চিন্তা ভাবনা ও জীবনদর্শনের উত্তরধিকার। গৌতম বুদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীর মত।
আমার শৈশব থেকে যুবক বয়স পর্যন্ত ভারতীয় উপমহদেশে পট পরিবর্তনকারী ঘটনা চলেছিল বিরামহীন ভাবে। যেগুলি ও তাদের অভিঘাত সম্যক ভাবে বুঝেছি ও বোঝার চেস্টা করেছি পরে। তারুণ্য প্রাপ্তির পর। তখন বামপন্থী রাজনীতি আমাকে অনেকের মত আকৃষ্ট করেছিল। সক্রিয় কর্মী হয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা লাভ করলেও বিনিময়ে পেয়েছিলাম আত্ম-জিজ্ঞাসার প্রবৃত্তি। প্রৌঢ়ত্বে এসে সেই তাড়না থেকে ইতিহাসকে বার বার ফিরে দেখতে গিয়ে আমি আবিষ্কার করেছি ‘ ওয়ান্ডার দ্যাটস ইন্ডিয়া’র আত্মাকে। যে আত্মা রবীন্দ্রনাথের ভারতভাগ্যবিধাতা, পতন-অভ্যুদয়- বন্ধুর পন্থায় যুগ যুগ ধাবিত যাত্রীদের পথ নির্দেশক – চির সারথি। না হলে কি করে ইংরেজদের হাতে ৪৫ থেকে ৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ লুণ্ঠিত হবার পর মেরে কেটে ৩২৫ কোটী টাকার এক্সচেকারকে সম্বল করে ভারত তার স্বাধীনতার চতুর্থ বছরে ঘটিয়ে ফেলতে পারে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন। তৈরী করে নিতে পারে তার অগ্রগতির ব্লু প্রিন্ট – পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। তাতে ত্রুটি ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু দিগদর্শনে খামতি ছিল না। ছিল না বলেই আরও অজস্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটকে সামলে, তামাম পশ্চিমী দুনিয়া – বিশেষত ইংরেজ প্রভাবিত দেশগুলি যারা ভবিষ্যৎ বানী করে রেখেছিল যে বহু জাত পাত, ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজজীবন নিয়ে জোড়াতালির দেশটা ১৯৪৭ থেকে বড় জোড় এক দশকের মধ্যে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে তাদের ভুল প্রমাণ করে দিতে পারে! আদায় করে নিতে পারে তার অনন্যতার স্বীকৃতি! মানবসভ্যতায় এরকম নজির আর নেই।
আসলে, ভারত কম করে ৫০০০ হাজার বছরধরে একক নয়, নানা সভ্যতার সংমিশ্রণের প্রবাহ। এই সমন্বয় সম্ভব হয়েছে হাজারো জন গোষ্ঠীর নিজেদের স্বাতন্ত্র্য আগলে পরষ্পরের কাছে আসার ও থাকার প্রতীতি থেকে। পরষ্পরের মেধা ও জ্ঞানকে স্বীকৃতি জানিয়ে – বহুবিধ নিরন্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিযোজনের মধ্য দিয়ে ভারত তার আত্মশক্তিকে রূপ দিয়েছে। তাকে পরিপুষ্ট করে তুলেছে। এই আত্মশক্তির জৌলুশ একদা দেখা গিয়েছিল শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও বানিজ্যে। তৎকালীন তক্ষশীলা, নালন্দা, বিক্রমশীলার মতো শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে জ্ঞানার্জনের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আসতেন (আজ যদিও উলট পুরাণ)। অপরদিকে, উন্নত সমুদ্র ও স্থলপথের মাধ্যমে রোম, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের সাথে মশলা, রেশম ও বস্ত্র বাণিজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল ভারতের, যা তার প্রাচীন অর্থনীতিকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছিল। দূর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যজুড়ে ছিল ভারতীয় ঔৎকর্ষের কদর। গড়ে উঠেছিল বহু সমৃদ্ধ নদী ও সমুদ্র সংলগ্ন বন্দর শহর। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিশ্ব বাণিজ্যে ভারতের অবদান সারা পৃথিবীর একত্রিত বানিজ্য মূল্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। প্রাচীন ভারত ‘সোনার পাখি’ শিরোপায় ভূষিত হয়েছিল। সামরিক ক্ষেত্রেও সমীহ আদায় করে নিয়েছিল উত্তরের গুপ্ত, মৌর্য বা কুশান কিম্বা দক্ষিনের চোলা থেকে সাতবাহনা সাম্রাজ্য, যাদের বিস্তার প্রাচীন রোমানদের তুলনায় কোন অংশে কম ছিল না।
এমনকি মুঘল আমলের একটা বড় সময় ধরে এই প্রাধান্য বজায় ছিল। আমাদের আধিপত্যের অধোগতির সূচনা হয় ইংরেজ আমলে। সৌজন্যে তাদের লাগামছাড়া শোষণ। এই সময়কালে সংগঠিত ভয়াবহতার চিহ্নগুলোকে নতুন করে তুলে আনছেন আধুনিক প্রজন্মের কৃতি ঐতিহাসিকরা। তাঁদের কাজ তাঁরা করুন। আরও বেশী করে করুন। এই ইতিহাস খনন থেকে আরও বেশী করে সামনে আসছে জগত সভায় ভারতের শ্রেষ্ঠ আসন অধিকারের বাস্তবতা।
আমার দীর্ঘ কর্ম জীবন কেটেছে পৃথিবীর উন্নত, উন্নয়নশীল, স্বাধীন আধুনিক ও উপনিবেশিক বহু দেশে। ওদের সমাজ ও সংস্কৃতিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যতটা বুঝেছি তা হলো ভারতআত্মায় নিহিত শক্তিকে যদি রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রের সর্বস্তরে প্রয়োগ করা যায় ভারত আবার জগৎ সভায় তার হারানো আসন ফিরে পাবে, এবং পৃথিবীকে তা মেনে নিতে হবে। কাজটা শক্ত নয়, কারণ তার একদিকে আছে প্রামাণ্য ইতিহাস, আর অন্য দিকে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মহেন্দ্রলাল সরকার, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, জগদীশ বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সাবিত্রী ও জ্যোতিরাও ফুলে, রামানুজন প্রমুখ একঝাঁক অবিস্মরণীয় প্রতিভার স্ফুরণে আলোকিত এক অসামান্য ঐতিহ্য।
ভারতীয় মেধার কদর এখন বিশ্বব্যাপী। এই মেধাবীরা নিজেদের সংগঠিত করে দেশকে বার্তা পাঠাক, যে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রকে পাশ্চাত্যের মত দলীয় রাজনীতির প্রভাব মুক্ত করে উদ্ভাবনমুখী করার। সেই কাজে নিজেদের যুক্ত করুক -তাদের মেধা ও মনন বিনিয়োগ করে। সৃষ্টি করুক এক এনেবলিং পরিবেশ যেখানে লালিত হবে জাত, ধর্ম, লিঙ্গ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে পালা বদলের থট লিডাররা। আগামী দু দশকের মধ্যে অভীষ্ট লক্ষপুরণ হবেই হবে। ভারতকে আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন ফিরিয়ে দিতে পারে এই একটি পদক্ষেপই যথেষ্ট।
জীবনের উপান্তে দাড়িয়ে আমি এই স্বপ্ন দেখি। আজকের ভারত সহ তামাম বিশ্বের ঘোলাটে ঘেঁটে থাকা প্রেক্ষাপটে আমার স্বপ্নকে অলীক বলে এক ফুতকারে অনেকেই উড়িয়ে দেবেন। দেওয়াটা একেবারে অসঙ্গত এমনটাও নয়। শুধু ভেবে দেখতে বলব এই স্বপ্ন ও ভাবনার বাস্তবায়নের জন্য দরকার একটাই উদ্যোগ। এবং সেই উদ্যোগকে লক্ষ্য পূরণের জন্য কাজে ইনভেস্ট করার দিগদর্শন ও মন।


