স্বামীকে হারানোর ব্যক্তিগত শোককে যিনি রূপ দিয়েছিলেন মানবসেবা, শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আজীবন অঙ্গীকারে
সুরাঙ্গন বিশেষ ফিচার: ভারত বিভাজন ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক সীমারেখা টেনে দেওয়ার ঘটনা নয়। ১৯৪৭ সালের সেই বিভাজন লাখো মানুষের জীবন, পরিবার, পরিচয় ও স্বপ্নকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। ঘরছাড়া হয়েছিল অগণিত মানুষ, বিচ্ছিন্ন হয়েছিল পরিবার, সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছিল অসংখ্য নারী-পুরুষ ও শিশু। ইতিহাসের পাতায় সেই সময়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা যতটা লেখা হয়েছে, ততটা আলোচিত হয়নি সেই অন্ধকার সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো অসংখ্য সাহসী মানুষের গল্প।
বেগম আনিস কিদওয়াই (১৯০৬–১৯৮২) তাঁদেরই একজন- একজন লেখক, সমাজকর্মী ও রাজনীতিক, যিনি ব্যক্তিগত শোককে পরিণত করেছিলেন মানবসেবার শক্তিতে।

দেশভাগের সময় তাঁর জীবনেও নেমে এসেছিল নির্মম ট্র্যাজেডি। তাঁর স্বামী সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রশমনের কাজে মুসৌরিতে ছিলেন। আনিস তাঁকে বারবার ফিরে আসার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু স্বামীর অবস্থান ছিল অটল- মানুষকে একত্রিত করার কাজ থেকে তিনি সরে আসতে চাননি।
শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বামী আর ফিরে আসেননি। শেষ চিঠির কয়েক দিন পর তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহ বাড়িতে পৌঁছায়। আনিসের ব্যক্তিগত পৃথিবী যেন মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু এই শোক তাঁকে ঘৃণার দিকে ঠেলে দেয়নি। বরং শোকের মধ্য থেকেই তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন নতুন জীবনের অর্থ।
শোক থেকে সেবার পথে
স্বামীকে হারানোর পর আনিস কিদওয়াই দিল্লির বিড়লা হাউসে মহাত্মা গান্ধীর কাছে যান। গভীর শোকে তিনি গান্ধীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। গান্ধী তাঁকে শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে এমন অসংখ্য মানুষ ছিলেন, যারা তাঁর মতোই স্বজন হারিয়েছেন, ঘর হারিয়েছেন, জীবনের নিরাপত্তা হারিয়েছেন। এই আহ্বান আনিসের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
তিনি চলে যান দিল্লির শরণার্থী শিবিরে। সেখানে তিনি শুধু ত্রাণ বিতরণ করেননি; মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন একজন আপনজনের মতো। ক্ষুধার্তদের খাবার, অসুস্থদের সহায়তা, বিচ্ছিন্ন পরিবারকে পুনর্মিলনের চেষ্টা- সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
কিন্তু তাঁর কাজের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল অপহৃত নারীদের সন্ধান ও তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা।
দেশভাগের সহিংসতায় নারী ও শিশুরা বিশেষভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। অনেক নারী অপহৃত হয়েছিলেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন এবং সীমান্তের ওপারে বা অপরিচিত এলাকায় আটকা পড়েছিলেন। আনিস কিদওয়াই অন্য নারী কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তাঁদের সন্ধান ও উদ্ধারের কাজে অংশ নেন। এই কাজ ছিল বিপজ্জনক, মানসিকভাবে কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রেই শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। মৃতদের প্রতিও তাঁর মানবিক দায়বদ্ধতা ছিল গভীর। তিনি মৃতদের গোসল করানো, কাফনের ব্যবস্থা এবং দাফনের মতো কাজ করেছেন। প্রয়োজনে নিজ হাতে কবর খোঁড়ার কাজও করেছেন। তাঁর কাছে মানবতা কোনো ধর্ম, সম্প্রদায় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

বিদ্বেষের সামনে যুক্তি ও সাহস
দেশভাগের পর ভারতীয় সমাজে সাম্প্রদায়িক সন্দেহ ও অবিশ্বাস প্রবল হয়ে উঠেছিল। এমন এক সময়ে দিল্লির একটি বড় জনসমাবেশে ভারতীয় মুসলমানদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তাঁদের দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে বলা হয় এবং বলা হয়, একই সঙ্গে দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা সম্ভব নয়। সেই পরিবেশে একজন নারী মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়ালেন।
তিনি আনিস কিদওয়াই। তিনি প্রশ্ন তুললেন- যারা অন্যের আনুগত্যের প্রমাণ দাবি করছেন, তাঁরা নিজেরাই কি সেই নৈতিক অবস্থানে আছেন, যেখান থেকে অন্যকে দেশপ্রেমের শিক্ষা দিতে পারেন?
এরপর তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেন। যারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন, তাঁদের অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। যারা ভারতে থেকে গেছেন, তাঁদের অনেকেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। তাই ভারতে থেকে যাওয়া মানুষের দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা ছিল বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। তাঁর বক্তব্যের পর সমাবেশের পরিবেশ বদলে যায়। নীরবতার পর শুরু হয় করতালি। এই ঘটনাটি আনিস কিদওয়াইয়ের চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে- তিনি বিদ্বেষের সঙ্গে বিদ্বেষ দিয়ে লড়েননি; যুক্তি, মর্যাদা ও মানবতার ভাষায় তার মোকাবিলা করেছেন।
গান্ধীর জন্য ‘শহীদ-এ-আজম’
আনিস কিদওয়াইয়ের লেখায় মহাত্মা গান্ধীকে ‘শহীদ-এ-আজম’ হিসেবে উল্লেখ করার একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সাধারণত ‘শহীদ-এ-আজম’ উপাধিটি ভগৎ সিংয়ের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। কিন্তু আনিস কিদওয়াই গান্ধীর ক্ষেত্রে শব্দটির একটি বিস্তৃত অর্থ দেখেছিলেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, ‘শহীদ’ শুধু সেই ব্যক্তি নন, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেন; সত্যের পক্ষে যিনি সাক্ষ্য দেন, তিনিও এক অর্থে শহীদ।
গান্ধী হিন্দু ও মুসলমান- উভয় সম্প্রদায়ের ভুলের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি কোনো পক্ষকে খুশি করার জন্য সত্যকে আড়াল করেননি। সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। শেষ পর্যন্ত সেই সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য তাঁকে জীবন দিয়ে দিতে হয়। এই কারণেই আনিস কিদওয়াইয়ের দৃষ্টিতে গান্ধী ছিলেন শুধু একজন শহীদ নন- তিনি ছিলেন ‘শহীদ-এ-আজম’, সত্যের সাক্ষ্য বহনকারী এক অসাধারণ মানুষ।
সংসদ থেকে সমাজসেবা
স্বাধীনতার পরও আনিস কিদওয়াইয়ের জনসেবার পথ থেমে যায়নি। তিনি কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে বিহার থেকে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন এবং দুই মেয়াদে- ১৯৫৬–১৯৬২ ও ১৯৬২–১৯৬৮- সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।সংসদে তিনি নারী অধিকার, সামাজিক পুনর্গঠন এবং মানবিক মূল্যবোধের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনও মূলত তাঁর দীর্ঘ সামাজিক কর্মকাণ্ডেরই সম্প্রসারণ ছিল।
আজও কেন প্রাসঙ্গিক আনিস কিদওয়াই?
বেগম আনিস কিদওয়াইয়ের জীবন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়, ব্যক্তিগত শোক ও সামাজিক সংকটের মুখে একজন মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন?
স্বামীকে হারিয়ে তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। শরণার্থী শিবিরে গিয়ে তিনি মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অপহৃত নারীদের উদ্ধারে তিনি ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
মৃতদের দাফনেও তিনি মানবিক মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। আর যখন সাম্প্রদায়িক সন্দেহ সমাজকে বিভক্ত করছিল, তখন তিনি সাহস করে সত্য কথা বলেছিলেন।

দেশভাগের ইতিহাসে তাঁর নাম হয়তো রাজনৈতিক নেতাদের মতো বহুল উচ্চারিত নয়। কিন্তু তাঁর জীবন দেখায়, ইতিহাস শুধু রাষ্ট্রনেতাদের সিদ্ধান্তে তৈরি হয় না; ইতিহাস তৈরি হয় সেইসব মানুষের কাজেও, যারা বিপর্যয়ের সময় অন্য মানুষের পাশে দাঁড়ান।
আনিস কিদওয়াই আমাদের মনে করিয়ে দেন- মানবতা কোনো দুর্বলতার নাম নয়; এটি সাহসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
ব্যক্তিগত শোককে জনসেবায় রূপান্তর করা, ঘৃণার বদলে সহমর্মিতা বেছে নেওয়া এবং জনপ্রিয়তার পরিবর্তে সত্যের পাশে দাঁড়ানো—এই তিনটি মূল্যবোধ তাঁর জীবনকে বিশেষ করে তুলেছে। দেশভাগের রক্তাক্ত অধ্যায় পেরিয়ে বহু দশক কেটে গেছে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিভাজন, অবিশ্বাস ও ঘৃণার বিরুদ্ধে আনিস কিদওয়াইয়ের মানবিক অবস্থান আজও প্রাসঙ্গিক। অন্ধকার সময়ে তিনি প্রতিশোধের আগুনে নিজেকে পোড়াননি; বরং মানুষের জন্য আলো জ্বালিয়েছিলেন।
সেই আলোই বেগম আনিস কিদওয়াইয়ের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।


