প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) কথা উঠলেই উরুগুয়ের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ইতিহাস সামনে আসে। কিন্তু সেই ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে অবিশ্বাস্য এক মানুষের গল্প, হেক্টর কাস্ত্রোর গল্প। ছোটবেলায় দুর্ঘটনায় ডান হাত হারিয়েছিলেন তিনি। অথচ সেই তিনিই ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে উরুগুয়ের জার্সিতে গোল করেছিলেন। তাঁকে নিয়েই এই গল্প।
উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওর এক দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। দিন আনি, দিন খাই, এমনই ছিল তাঁদের সংসার। অভাব এতটাই তীব্র ছিল যে, অন্য শিশুদের মতো খেলাধুলা করে সময় কাটানোর সুযোগ পাননি কাস্ত্রো। তাই অল্প বয়সেই তাঁকে বড় হয়ে উঠতে হয়েছিল। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি কাঠ কাটার কাজ শুরু করেন। তিন বছর যেতে না যেতেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে কাঠ কাটার সময় ডান কনুই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাঁর হাত।

এক মুহূর্তে বদলে যায় জীবন। ভেঙে যায় গোলরক্ষক হওয়ার স্বপ্ন। অনেকেই হয়তো এমন পরিস্থিতিতে স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিতেন। কিন্তু হার মানেননি কাস্ত্রো। সেই লড়াইই তাঁকে পৌঁছে দেয় বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে।
উরুগুয়েতে হেক্টর কাস্ত্রো পরিচিত ছিলেন ‘এল ডিভিনো মানকো’ বা ‘এক হাতের দেবতা’ নামে। এক হাত নিয়েও প্রায় ১৫ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি এমন সব কীর্তি গড়েছিলেন, যা রূপকথাকেও হার মানায়। উরুগুয়ের ফুটবলের কিংবদন্তিদের অন্যতম ছিলেন কাস্ত্রো।
বিশ্বকাপ ছাড়াও তিনি জিতেছেন কোপা আমেরিকা ও অলিম্পিক স্বর্ণপদক। ক্লাব ক্যারিয়ারেও অসংখ্য ট্রফি জিতেছেন তিনি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে অ্যাটলেটিক ক্লাব লিটোতে যোগ দিয়ে প্রতিভার ঝলক দেখান। ১৯ বছর বয়সে সুযোগ পান উরুগুয়ের অন্যতম সেরা ক্লাব নাসিওনালে। ১৯২৩ সালে নাসিওনালে যোগ দিয়েই লিগ শিরোপা জেতেন। একই বছর জাতীয় দলেও অভিষেক হয় তাঁর।
যদিও ১৯২৪ সালের অলিম্পিক দলে জায়গা হয়নি। চার বছর পর, ১৯২৮ সালের অলিম্পিকে তিনি ছিলেন উরুগুয়ে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সেই আসরেও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো অলিম্পিকে সোনা জেতে উরুগুয়ে। কাস্ত্রোও অর্জন করেন নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা।
ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপের আসর বসেছিল উরুগুয়েতে। ১৩ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত চলেছিল এই প্রতিযোগিতা। অলিম্পিকে পরপর দু’বার সোনা জয়ের সাফল্য এবং স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্যাপনের আবহকে সামনে রেখে আয়োজক হওয়ার অধিকার পায় দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। রাজধানী মন্টেভিডিওতেই হয়েছিল টুর্নামেন্টের সব ম্যাচ।
আর ফুটবলের মহাযুদ্ধের সেই আসরই কাস্ত্রোকে পৌঁছে দিয়েছিল কিংবদন্তির মর্যাদায়। ১৯৩০ বিশ্বকাপে পেরুর বিপক্ষে উরুগুয়ের প্রথম ম্যাচে একমাত্র গোলটি আসে তাঁর পা থেকেই। দেশের ইতিহাসে বিশ্বকাপে প্রথম গোলদাতা তিনিই। তবে পরের ম্যাচে সুযোগ পাননি তিনি। তাঁর জায়গায় দলে আসেন জুয়ান পেরেগ্রিনো আনসেলমো। রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে তিনি সেই সুযোগের যথার্থ মূল্য দেন।
যদিও সেমিফাইনালে আনসেলমো চোটে পড়লে ফাইনালে আবার সুযোগ পান কাস্ত্রো। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে উরুগুয়ের শেষ গোলটি আসে কাস্ত্রোর পা থেকেই। এই কাহিনি কি রূপকথার থেকে কোনো অংশে কম?
১৯৩৬ সালে বুটজোড়া তুলে রাখেন তিনি। ফুটবল জীবনের পাশাপাশি কোচ হিসেবেও সফল ছিলেন কাস্ত্রো। খেলোয়াড় হিসেবে তিনবার উরুগুয়ের জাতীয় লিগ জিতেছিলেন। ১৮১ ম্যাচে ১০৭ গোল করে অবসরের সময় তিনি ছিলেন প্রিমেরা ডিভিশনের চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতা।


