মজনু মিনহাজ মঞ্জু
প্রকৃত নাম প্রবোধ কুমার। জন্ম ১৯০৮ সালে সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে। পৈত্রিক নিবাস বিক্রমপুর। শিক্ষা জীবন শুরু কলকাতায়। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের সাথে একদিন বিতর্কে বাজি রাখলেন, ভালো লেখা হলে পত্রিকায় অবশ্যই ছাপা হবে এবং গল্প লিখে তিনি তিন মাসের মধ্যে ছাপিয়ে দেখাবেন। লিখলেন ‘অতসী মামী’। এটিই প্রথম লেখা। ছাপা হলো ভারতীয় বিচিত্রায়। লিখেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নাম নিয়ে। সেই থেকে তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক প্রতিভা যিনি পূর্ব সংস্কারাচ্ছন্ন মন দিয়ে জীবনকে অনুসন্ধান করেননি। মানব বেদনা, মানব সংকট, সমাজ চেতনা, ফাঁপা অভিজাত্যবোধের শৃঙ্খল, অর্থনৈতিক শোষণ ও মানব মুক্তি ছিল তার সাহিত্যের সৃষ্টির মূল প্রেরণা।

বাধা ধরা কোন নিয়ম তার ভালো লাগতো না। কৈশোরে টাঙ্গাইল থাকার সময় মাঠে, ঘাটে, ধান ক্ষেতের, আলে আলে ঘুরে বেড়াতেন উদভ্রান্তের মতো। চমৎকার বাঁশি বাজাতেন । আর গান গাইতেন দরাজ গলায় । হঠাৎ কখনো উধাও হয়ে যেতেন। নদীর ধারে ছেলেদের নৌকার সাথে ভাব জমিয়ে কাটিয়ে দিতেন দু-তিন দিন । ১৯৩৬ সালে ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ ও ‘জীবনের জটিলতা’ প্রকাশিত হয় । তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য লেখাগুলো হচ্ছে দিবা রাত্রির কাব্য শহরতলী, দর্পণ, চিহ্ন, সার্বজনীন, স্বাধীনতার স্বাদ প্রভৃতি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ বছরের লেখক জীবনের প্রায় চল্লিশটা উপন্যাস, ২২৩ টি গল্প লেখেন। একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক লিখেছেন ‘ভিটেমাটি’।
১৯৫৫ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অসুস্থ হয়ে কয়েক মাস হাসপাতালে কাটান। ১৯৫৬ সালে তিরিশে নভেম্বর আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৩রা ডিসেম্বর ভোর চারটায় মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ও ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ লিখে মানিক বিশ্ব সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছিলেন। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের সবচেয়ে পরিচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি হল ‘ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে- ভদ্র পল্লীতে তাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না’। এই লাইনটিতে গ্রামীণ মানুষের চরম অবহেলা ও কষ্টের জীবন বাস্তবতার গভীর চিত্র ফুটে উঠেছে।
এই উপন্যাসের ভাষা অত্যন্ত কাব্যিক এবং গভীর জীবন দর্শন সমৃদ্ধ। লেখক ময়না দ্বীপের কথা নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। সাহিত্য সমালোচকদের মতে পদ্মা নদীর মাঝি কেবল একটি সাধারণ জেলেপাড়ার গল্প নয় বরং পদ্মা নদীর ভাঙ্গন, প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা এবং প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রামের এক বাস্তবসম্মত দলিল। মানিকের এই সৃষ্টিই কর্মের আলোচনা ও বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রতিপাদ্য বিষয় পরিলক্ষিত হয়। পদ্মা পারের জেলেদের সংগ্রামী জীবন ও জীবিকা, কেন্দ্রীয় চরিত্র কুবের মাঝি ও কপিলার পরকীয়া প্রেম, হোসেন মিয়ার যেকোনো উপায়ে ময়না দ্বীপে লোক নিয়ে বসতি স্থাপন।

হোসেন মিয়া মিথ্যা চুরির অভিযোগে যখন কুবের মাঝিকে ময়না দ্বীপে যেতে বাধ্য করে তখন শালিকা কপিলার সেই কলিজা কাটা সংলাপ ‘আমারে নিবা মাঝির লগে ? কুবের সম্মতি দিয়ে বলে ‘তুই যাবি কপিলা, এত বড় পথতো আমি একা পাড়ি দিতে পারুম না রে।
‘পদ্মা নদীর মাঝির’ মাধ্যমে বাংলা উপন্যাস কে কলকাতা কেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত জীবন বৃত্তের বাইরে পূর্ব বাংলার বৈচিত্র্যময় সংগ্রামশীল মৃত্তিকা সংলগ্ন জীবন পরিসরে সম্প্রসারিত করেন। ১৯৯৪ সালে লোকনাট্যদল ঢাকার মঞ্চে ‘পদ্মা নদীর মাঝির’ বেশ কিছু প্রদর্শনী করেছে যার নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় ছিলেন অভিনেতা লিয়াকত আলী লাকি। তাদের প্রযোজনার মাধ্যমে তারা মানিকের হৃদয়স্পর্শী কাহিনী ও বিশিষ্ট শিল্প রীতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। গৌতম ঘোষ পদ্মা নদীর মাঝি নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তাতে দুই বাংলার অভিনেতা, অভিনেত্রী অংশগ্রহণ করেছেন। ইতিমধ্যে পদ্মা নদীর মাঝি দেশ-বিদেশে বহু প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়েছে – যা নিঃসন্দেহে বাংলা চলচ্চিত্রে একটি নতুন সংযোজন।


